মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসরঃ গল্প -শরশয্যা/ সাঁজবাতি





শরশয্যা ঃ

নিরুপমা  ভালোবেসে বিয়ে করেছিল অতনুকে। নিরুপমা ভীষণ ঘরোয়া । বিয়ের আগে সারাদিন পড়াশোনা আর গানবাজনা নিয়ে দিন কাটত তার । একদিন এক বনেদী বাড়ির ছেলে অতনুর ভালোবাসা তার মনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। সারা ঘরে প্রাচুর্য্য র ছড়াছড়ি। কোথাও কোনো অভাব নেই তাদের। নিরুপমা আর অতনু একই কলেজে পড়াশুনা করত।
প্রথম দিন দেখেই অতনুর নিরুপমা কে ভালো লেগে গিয়েছিল।

ভীষণ শান্ত, নম্র, ভদ্র স্বভাবের মেয়ে ছিল নিরুপমা। সকলেরই ভালো লাগে তাকে। অতনু ব্যতিক্রম কিছু নয়। কলেজের বছর শেষে নিরুপমা কে একদিন একরকম ভাবে নিজের মনের কথা বলেই ফেলেছিল সে। অতনু ও ভীষণ সুদর্শন। নিরুপমার সম্মতি না দিলেও অসম্মতি ও জানায়নি সেদিন। অতনু বাড়ির লোককে জানিয়েছিল তার নিরুপমা কে ভীষণ পছন্দ বিয়ে করলে সে তাকেই করবে সে কখনো বিয়ে করবে না।
অতনুর বাড়ি ছিল গোরা ব্রাহ্মণ। কায়স্থ বাড়ির মেয়েকে বিয়ে করাতে তাদের আপত্তি ছিল খানিক।

কিন্তু ছেলের পছন্দের উপর তারা সরাসরি না করতে পারেননি। নিরুপমা কে দেখতে এসে একদেখায় পছন্দ হয়ে গিয়েছিল নিরুপমা কে অতনুর বাড়ির লোকের ।  কিন্তু তার মায়ের ইচ্ছে ছিল তার মায়ের ছোট বেলাকার বান্ধবীর মেয়ের সাথে অতনুর বিয়ে দেবে । তাই শাশুড়ি খুব একটা মনঃপুত ছিলেন না।  বিয়ের পর পড়াশোনা গান-বাজনা তিনি এগুলো পছন্দ করতেন না ।  তিনি ভীষণ একগুয়ে মানুষ ছিলেন।  কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে একরকম মেনে নিয়েছিলেন সবটা। কিন্তু পড়াশোনা গান-বাজনা কিছুই করতে পারবে না এমন নিয়ম জারি করা হয়েছিল নিরুপমার সব শখ আহ্লাদের উপর। কিন্তু ভালো ছেলে দেখে বাবা-মার আপত্তি করলেন না এ বিয়েতে।

পাকা দেখার সাতদিনের মধ্যে বিবাহ সম্পন্ন হয়।বাবা মাও একটু স্বস্থি পান।মেয়ের ভালো বিয়ে হয়েছে দেখে।কিন্তু বিধিলিপি লিখেছিল অন্য লিখন।

বিয়ের মাসখানেকের  মধ্যে অতনু ভালো চাকরি নিয়ে চলে যায় বিদেশে। বনেদী বাড়ি। চারদিকে চাকর বাকর। চারিদিকে বৈভব যেন ছড়ানো ছিটানো। কিন্তু নিরুপমা র কপালে জুটল না কোনো সুখ।
 ধীরে ধীরে নিরুপমা র সকল স্বপ্ন যেন ভঙ্গ হতে শুরু করল।
বাড়িতে সকল কাজের লোককে বরখাস্ত করা হল। সকল দায়ভার তুলে দেওয়া হল নিরুপমার উপর।মা বাবার বড় আহ্লাদের , আদরের মেয়ে ছিল নিরুপমা। বিয়ের পর তার জীবনে নেমে এল একে একে অশনি সংকেত।
শ্বশুর বাড়ি ছিল কুসংস্কার আচ্ছন্ন ভীষণ গোড়া পরিবার। । বিয়ের আগে দেওয়া সমস্ত প্রতিশ্রুতি বিয়ের পর সকলে যেন ভুলে যায়।
নিরুপমার ধীরে ধীরে পরিচয় হয়ে ওঠে বাড়ির কাজের লোক হিসাবে।
সারাদিনের অকথ্য অত্যাচার আর খাটুনির পর ঠিক মত খেতে দেওয়া হতনা তাকে। শোয়ার জন্য বরাদ্দ করা হল স্যাঁত স্যাঁতে একটি ঘর। দিনদিন যন্ত্রনার পরিমান বাড়তে থাকে।মা বাবা র কাছে যাওয়ার অনুমতি পর্যন্ত ছিলনা তার। শাশুড়ীর গালিগালাজ সহ্য করে দিন যাপিত হত তার।সে ভীষন নরম মনের ছিল।দুঃখ যন্ত্রনার প্রতিবাদ সে কখোনো করতে পারেনি। শুধু সহ্য করে গেছে নীরবে।
সে ভীষন ঈশ্বরের বিশ্বাসী ছিল। ঈশ্বরকে বলত এ জীবনটা শেষ করে দেওয়ার জন্য।

লুকিয়ে স্বামীকে চিঠি লিখেছিল দুই একবার কিন্তু সে চিঠির কোন জবাব আসেনি। হয়তো সেও তাকে ভুলে গেছে আধুনিকতায় মিশে। নিরুপমা স্বচক্ষে দেখে ছিল ভালোবেসে বিয়ে করার পরেও ভালোবাসা কিভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। এ পরিবর্তন তার জানা ছিল না তাই সে মনে মনে ঠিক করেছিল নিজেকে একেবারে শেষ করে দেবে।
 তার মনে হয়েছিল এ পৃথিবীতে তার প্রয়োজন এবার বোধ হয় ফুরিয়েছে। বিবাহিত মেয়ে বাপের বাড়িতে ওঠার চেয়ে তার মরে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে হয়েছিল। তাই দিন দিন সে মৃত্যুর দিকে নিজেকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে লাগলো।


সে যেন মনে মনে‌ জেদ করেছিল।এ জীবন সে আর কিছুতেই রাখবেনা।সে ইচ্ছে করে অযত্ন বাড়ালো শরীরের।শরীর ক্ষীন হতে শুরু করল।স্বামীকে কয়েকবার চিঠি লিখেছিল বটে। কিন্তু কোনো সদুত্তর না পাওয়ায় সে চিঠি লেখাও বন্ধ করে দেয় একসময়।

সকাল থেকে রাত সকল কিছু তার এক হয়ে গেল একসময় অনিয়মে শরীর জবাব দিল। অসুস্থ হয়ে পড়লে ভীষন।প্রথাগত নিয়মে কবিরাজ মশাই কে খবর দেওয়া হল। কিন্তু কিছুতেই অনুসন্ধান করতে পারলেননা। অসুখটা কি। কেউ যদি ইচ্ছে করে মরে যেতে চায় তাকে কেউ বাঁচাতে পারেনা।

একদিন এক পড়ন্ত লগ্নে গোধূলি বেলায় সকল মায়া ত্যাগ করে নিরুপমা চিরবিদায় নিল এ পৃথিবী থেকে। এ যেন এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।

হয়তো ফিরে আসবে অতনু। বুক হয়তো কখনো কাঁদবে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল তাই ।কিন্তু আদৌ কি কিছু তার এলো গেলো ? এক বছর,দু বছর, তিন বছরের মাথায় সে আবার বিয়ে করবে আবার সংসার পাতবে। খালি হল কেবল মায়ের বুক। সর্ব হারা হলো একটি কেবল মা। পৃথিবীতে আর কারোর কিছু এলো গেল না। এ যেন নিরুপমার এক নীরব অভিমান ছিল যা তাকে মৃত্যু পথে ঠেলে দিল চিরতরে।



মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ