মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসর: তিস্তার পাড়ে / সাঁজবাতি




তিস্তার পাড়ে / সাঁজবাতি

 

 সেদিন সৌম্যর সাথে তিস্তার চরে বেড়াতে যায় মেহুল দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার বার। নতুন করে পুরনো ঘটনাগুলো একে একে ভেসে উঠছিল তার চোখের সামনে। তিন বছর আগের এই দিনটিতে কয়েকটি বিশেষ মুহূর্ত ঘটে গেছিল। সেগুলোই বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। আজকের দিনটিতেই কলেজে তাদের প্রথম আলাপ।কলেজ ছুটির পর সকলে এসেছিল তিস্তা নদীর সৌন্দর্য দেখতে। মেহুলের ভীষন ভালো লেগেছিল নদীর পাড়। সৌম র পছন্দের সাথে ওর ভালোলাগা র অনেক মিল।দুজনাতে মাঝেমধ্যে চলে আসত তিস্তার বুকে সূর্যাস্ত দেখতে

 

প্রায় বিকেল তখন। বাতাস ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তিস্তার জল সেদিন ছিল কিছুটা কম। ওরা তখন পাড়ের উপর ভাঙাচোরা একটা নৌকার উপর বসে।, গুটিগুটি পায়ে নদীর ঢেউ এসে ধাক্কা মেরে যাচ্ছিল দুজনের পায়ে

 

মেহুল এক মনে নদীর দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে দেখে সৌম্য বলল কিরে কি ভাবছিস? 

মেহুল বললো কিছু না। ভীষণ ভালো লাগছে এখানে বসে থাকতে

সৌম্য বলল তাহলে তুই আসতে কেন চাই ছিলিস না প্রথমে?

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেহুল বলল আসতে তো চাই কিন্তু নদীর ধারে এলেই মনটা বড্ড আনমনা হয়ে যায়

 

নৌকা থেকে হঠাৎ করে মেহুল উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সৌম ও তার পিছু পিছু যায় ।পাড়ের একবারে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ায় দুজনে

 

জলের কাছ থেকে লোহার জালে বাঁধা বড় বড় পাথর নেমে গেছে গাছের নিচে পর্যন্ত

 

জলের স্রোত এখানে একটু বেশি বলে মনে হয়। এখান থেকে সামনের কিছুটা পর্যন্ত জল তারপর শুরু হয়েছে বালির ঢেউ। ওপারে শুধু বালি আর বালি। 

 

কিছুটা দূরে যেখানে জল কম তার ওপর অনেকটা বালি রয়েছে সেখানে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে বল নিয়ে খেলা করছে। তাদের হাসি আর কথাবার্তা টুকরো টুকরো ভেসে আসছে জলের উপর দিয়ে

 

এমন মুহূর্তে গোধূলি বেলায় বাধানো সিঁড়ির শেষ ধাপ মিশে যাচ্ছে জলের সাথে। তার ওপরে মেহুল গিয়ে বসলো

 

সেখানে ছোট ছোট ঢেউ গুলো পায়ের কাছে এসে ভেঙ্গে যাচ্ছিল ।কিছুটা জল পেরালেই বালির ঢেউ ।ওপারের ধারে হেলে পড়া শিরিষ গাছটা দোলা খাচ্ছিল ধীরে ধীরে

 

 মেহুল  সৌমকে জিজ্ঞাসা করল তুই কবে যাচ্ছিস?

 

সৌম্য বললো সামনের শনিবার

 

সামনে শনিবার সৌম্য চলে যাচ্ছে বিদেশে ভালো চাকরি পেয়েছে। সৌম্য র বহুদিনের ইচ্ছে যে বিদেশি

কোম্পানীতে কাজ করার ।তার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে

 

মেহুলের চোখ দুটো যেন ছল ছল করে উঠলো, কিছু যেন বলছিল ওর চোখ দুটো। কিন্তু মুখ থেকে কিছু বলতে পারছিলনা

 

সৌম্য বলল কিরে কোথায় হারিয়ে গেলি বলো না ? মেহুল বলল কোথাও না। কিছু না এই চারপাশটা তাকিয়ে একটু দেখছিলাম

 

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর। সৌম্য বলল তোর কি হয়েছে বলত? এই তো কলেজে ছটফট করছিলি এখানে এসে চুপচাপ হয়ে গেলি কেন? সেদিন কলেজে গেট টুগেদার ছিল। বছরগুলো সুখ দুঃখ মান অভিমান নিয়ে ভালো কেটেছে

 

মেহুল বললো এমনি! আমার কি মনে হয় জানিস মাঝেমধ্যে আমাদের সবাইকেই একটু চুপ করে থাকতে হয় চুপ করে থাকাটা বেশ ভালো অভ্যাস

 

মেহুল উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল । কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা ভাঙা নৌকোর উপরে গিয়ে বসলো

 

কিছু বুঝতে পারল না সৌম। ও এগিয়ে গেল মেহুলের পিছু পিছু। মেহুলকে গিয়ে বলল কি হয়েছে বলবি?

 

মেহুল বলল এখন কি মনে হচ্ছে জানিস যদি এই মুহূর্তটা কে ক্যানভাসে তুলে রাখতে পারতাম দারুন হতো রে

 

সৌম জানেনা। মেহুল ওকে ভালোবাসে। মেহুল  কখনো বলে উঠতে পারেনি সৌমকে

ওরা কলেজে ভীষণ ভালো বন্ধু ।দুজনেই দুজনকে পছন্দ করে। কিন্তু কেউ কাউকে বলে উঠতে পারেনি যে তারা সারা জীবনের জন্য দুজন দুজনকে পাশে পেতে চায়

 

সৌম  বিদেশে চলে যাওয়ার কথা মেহুল কে যে দিন জানায়,মেহুলের আনন্দ হয়েছিল। কিন্তু বুকের ভিতরে একটা চিনচিনে ব্যাথা অনুভব করেছিল

 

সৌম কে শুভেচ্ছা জানিয়েছে ।মেহুল চায় ও বিদেশে গিয়ে নিজের জীবনে সেটেল হোক। ভালো চাকরি করুক। কিন্তু ওকে ছাড়া কিভাবে থাকবে ও জানে না

 

আদৌ কি কোনদিন ওকে বলে উঠতে পারবে যে, ওকে মেহুল ভালোবেসেছে ।সেটাও ও জানে না। 

 

পরশু সৌম বিদেশে চলে যাচ্ছেমেহুল নদীর পাড়ে যেতে ভীষণ ভালোবাসে। তাই সৌমকে বলেছিল তুই চলে যাওয়ার আগে আমাকে একটু তিস্তার পাড়ে নিয়ে যাবি?

 সৌম বলেছিল বেশ যাবি

 

তাই  দুজনে এসে তিস্তার পাড়ে বসেছে। মেহুল সৌমকে হঠাৎ করে বলল  ,তুই আমাকে ভুলে যাবি না তো?

সৌম বলল,তোকে ভুলে যাব এটা কি কখোনো সম্ভব?

 

মেহুলের কিছু ভালো লাগছিল না। থেমে থেমে কথা বলছিল।সৌম বলল তোর কি হয়েছে বল তো? সত্যি করে বল, তুই কি প্রেমে পড়েছিস?

 

মেহুল সৌমের দিকে এক দৃষ্টি তাকিয়ে রইল ।সৌম ওর চোখের ভাষাটাই বুঝতে পারেনি

 

সোজা হয়ে বসে ঘাড়টা ঘুরিয়ে মেহুল বলল কার?

 

সৌম বলল, কার আবার আমার

 মেহুল হেসে বলল তোর প্রেমে পড়বো! আর লোক নেই প্রেমে পড়ার, তোর  মত ছেলের প্রেমে কেউ পড়ে নাকি?

 

মেহুলের ঐ জায়গাটা ভীষণ প্রিয়। তিস্তার পাড় চারপাশে শুধু গাছ। শিরিষ, পলাশ ,কৃষ্ণচূড়া আরো নাম না জানা অনেক গাছ। 

 

একটু দূরেই শ্মশান। ওই রাস্তার উপর কয়েকটা লোক যাতায়াত করে। জায়গাটা একটু নিরিবিলি নির্জন

সৌম একটা সিগারেট ধরাল

 

সিগারেট টা ছুঁড়ে ফেলে মেহুল বলল বাইরে গিয়ে যত খুশি সিগারেট খাবি আমার সামনে একটাও সিগারেট ধরাবি না

 

সৌম বলল,তোর কি হয়েছে আজকে ?কেন এত রিঅ্যাক্ট করছিস তুই? তুই কি কিছু বলবি আমাকে ?আমি কি কিছু অন্যায় করেছি তো বল এরকম চুপ করে থাকিস না ।তোর কি হয়েছে?

 

মেহুল বললো আমার কেন কিছু হতে যাবে। তোর যদি আমার সাথে সময় কাটাতে ভালো না লাগে তো তুই চলে যা ।আমি কি তোকে এখানে নিয়ে আসতে বলেছি ?তোকে কি আমি বলেছিলাম যে তুই আমার সাথে আয় ।তোর ইচ্ছে হয়েছে তাই তুই এসেছিস। তোর যদি ইচ্ছে না হয় তুই এখান থেকে চলে যা

 

বুক ফাটবে তবু মুখ ফুটবে না। ওদের এতদিনকার বন্ধুত্ব।সৌম ভালো মত জানে মেহুলের কিছু একটা হয়েছে

 

ওরা একে অপরের পরিপূরক হয়ে ছিল। যেদিন দূরে যাওয়ার কথা হল সেদিন থেকে মেহুল নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না

 

সৌমের ও বোধহয় খারাপ লাগছিল কিন্তু ও হয়তো প্রকাশ করতে চাইনি ।মেহুল কি ভাববে তাই ভেবে হয়ত

 

মেহুলের চোখ থেকে জল বেরিয়ে  আসবে হয়ত এবার।আর নিজেকে আটকে রাখতে পারছেনা

 তখন প্রায় সূর্যাস্ত। সূর্য আর মাটির মিলন। সূর্য ডুবে যাচ্ছে তিস্তার জলে আস্তে আস্তে। নৌকার উপর বসে  হঠাৎ হাতটা চেপে ধরে সৌম বলল,তুই যাবি  আমার সাথে?

 

মেহুল ওর দিকে একবার তাকিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললো

 ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল ভেঙে পড়লো ওর কাঁধের ওপর ।তারপর বলল তুই আমায় ছেড়ে যাস না। আর কিছুই বলতে পারল না

 

সৌমের কাছে সবটা পরিষ্কার হয়ে গেল। আমাদের এমন অনেক কথা থাকে যেগুলো আমরা মুখ ফুটে হয়ত বলতে পারি না। বলে দেয় আমাদের আচরণ

সৌম মেহুলের মাথায় হাত রেখে বলে,পাগলী এতটুকু বলতে পারিসনি! 

 

সৌম ঠিক করে মেহুলের বাড়িতে সবটা জানাবে কিন্তু হাতে মাত্র একটা দিন ও কি করবে কিছু বুঝতে পারছিল না

 

সৌমের মা ছিল সৌমের ভীষণ ভালো বন্ধু। মাকে গিয়ে সবটা বলল। মা সবটা বুঝলো । ওদের বাড়িতে সকলেই মেহুলকে ভীষণ পছন্দ করত

 

ঠিক হলো এক মাস বাদে সৌম ফিরে এলে ওদের পাকা কথা বলে বিয়ের ব্যবস্থা করা হবে। শনিবার সৌম চলে যায় বিদেশে। মেহুল দিন গুনতে থাকে। একদিন ঐ দিন গোনা ফুরায়।সৌম ফিরে আসে।আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে হয় ওদের।  মেহুলকে নিয়ে ও বিদেশে ফিরে যায়

 

আজ কেটে গেছে অনেক গুলো বছর।সৌম্য ,মেহুল ও ওদের একটা ছোট্ট মেয়ে তিতলিকে নিয়ে তিনজনের সুখী সংসার







মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ