মহাকাব্য ও পুরাণ চর্চা পর্বঃ ৮
অভিশপ্ত, উপেক্ষিত কৃষ্ণপুত্র শাম্ব / প্রবীর দে
বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ যে-কোনো দৈবিক ঘটনাকে সাধারণত অবিশ্বাস করে। পক্ষান্তরে সে
নির্মাণ করতে চায় এক বাস্তব বিশ্ব।মহাকাব্যের অধিকাংশ চরিত্রই অতিপল্লবিত,কখনও কল্প- কাহিনি-আক্রান্ত। তবে মানুষ কিন্তু এই দৈবিক পৌরাণিকতার মধ্যেই খুঁজে পেতে চেয়েছে জীবনের রূপ। মেলাতে চেয়েছে নিজেকে, সমাজকে। বিশ্বাসী মানুষের চোখে পুরাণ তাই অখণ্ড। কিন্তু আধুনিক মানুষের চোখে পৌরাণিক ঘটনা
সবসময় বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবুও ভাববার বিষয় এই যে পুরাণ যুগে যুগে সৃষ্টিশীল
মানুষকে দর্শনের খোরাক এনে দিয়েছে।
মহাকাব্য ইতিহাস কিনা এ
বিষয়ে যাঁরা প্রশ্ন তোলেন , তাঁদেরকে তবে একটা কথা বলি।, মহাভারতে আছে ---ইতিহাসবিদং
চক্রে পূণ্যং সত্যবতীসুতঃ’ (কালকূট এর ব ই শাম্ব থেকে জেনেছি,১৯৯৬: ১০১৫)।― একথায় বোঝা যায় যে, মহাভারত কিন্তু একটি ইতিহাস
গ্রন্থও।আমি জানি , শুধু এর ভিত্তিতেই প্রমাণ হয় না। তবে ইতিহাসের উপাদান কিন্তু মহাকাব্যের
রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তর্কে গিয়ে কাজ নেই। ইতিবৃত্তের অলৌকিকতা থেকে সত্য-সন্ধানই
আমাদের লক্ষ্য হ ওয়া উচিৎ।
এবার আসি অন্য একটি বিষয়ে।
অভিশাপ একটা বংশের ধ্বংসের
কারন হতে পারে এটা মহাকাব্য থেকেই আমাদের প্রথম জানা। মহাভারত থেকে জেনেছি
শ্রীকৃষ্ণের প্রতি গান্ধারী র অভিশাপ এবং ,শ্রীকৃষ্ণ ও জাম্ববতী-পুত্র শাম্বের প্রতি মুনিদের ভয়ংকর অভিশম্পাতের ফল ছিল যদুবংশ নাশ।অভিশম্পাতের প্রেক্ষিত সকলের জানা,তাই বিস্তৃত ব্যাখ্যায়
গিয়ে কাজ নেই,তবে প্রেক্ষিত বিশ্লেষণ করা
যেতেই পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা অযাতীত,অনাঙ্খাকিতভাবে কারও জীবন যদি শুধু অভিশাপে অভিশাপে জর্জরিত হয়ে যায় সেটি তখন
পরিণত হয় ট্রাজিক কাহিনীতে।
কৃষ্ণ যাদবশ্রেষ্ঠ। তিনি কেবল
নরপতি নন, কালান্তরে ভগবান কৃষ্ণ। তিনি কখনোই রাজসিংহাসনের অধিকারী ছিলেন না। কিন্তু
রাজা না হয়েও তিনি রাজ-অধিক ক্ষমতাধারী। তিনিই পাণ্ডবদের প্রতিষ্ঠা ও
মন্ত্রণাদাতা ঈশ্বর—স্বয়ং বিষ্ণুর বরপ্রাপ্ত। কিন্তু এই ঈশ্বর মহিমার কৃষ্ণও খোদ বেদব্যাসের হাতেই যেন বাস্তব মনুষ্য চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। যুগের
অনিবার্য প্রবহমানতা আর কালের সত্যই নির্ধারণ করে দেয় তাঁর ভবিতব্য। আত্মীয়
হত্যার বিরাট যজ্ঞ কুরুক্ষেত্রেই অভিশপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। কেননা জ্ঞাতিক্ষয়কর
যুদ্ধ নিবারণে সমর্থ হয়েও কৃষ্ণ তা করেননি। গান্ধারী তাই তাঁকে অভিশাপ দেন । যুদ্ধ না করেও বিরাট কৌশলী, সময় সময় ঐশ্বরিক
শক্তি ভর করে পাণ্ডবদের জেতানোর যাবতীয় পরিকল্পনাকারী― শ্রীকৃষ্ণ যখন এভাবে মারা গেলেন আর যদুবংশও শেষ হতে
লাগলো..... ! তখন মনে হয় ....গান্ধারীর অভিশাপ তাঁকে সাধারণ মানুষের স্তরে নামিয়ে এনেছিল। মহাকাব্য হয়ত এখানেই বাস্তবতা খুঁজতে চেয়েছিল ।
বাস্তব ঘটনার অনুসন্ধানের পরে প্রাপ্ত ঘটনাই যে ইতিহাস!তাহলে,যদুবংশ ধ্বংসের ইঙ্গিত ছিল ই গান্ধারীর প্রার্থনায়(?)। কুরক্ষেত্র ও পুষ্কর হ্রদ পার্শ্বস্থ অসংখ্য মৃত্যুর জন্য দায়ী তাই কৃষ্ণ। অভিশাপ-গঞ্জনার এবং তার ফলাফলের এ এক বিচিত্র নমুনা !
এবার শোনাবো অভিশাপে অভিশাপে
বিধ্বস্ত ,যদুবংশ ধ্বংসের আরও এক হতভাগ্য নায়কের করুণ কাহিনী যার কথা মহাভারতের ‘মৌষল পর্বে’ উল্লেখিত হয়েছে। তিনি হলেন শ্রীকৃষ্ণপুত্র শাম্ব....
শ্রী কৃষ্ণের এবং জাম্ববতীর সন্তান শাম্ব।শিব ও পার্বতীর আশীর্বাদে
শিবের মত গুণসম্পন্ন হওয়ার প্রার্থনায় (কৃষ্ণর প্রার্থনায়) যার জন্ম, সেই শাম্ব। দুর্যোধনের মেয়েকে জোর করে বিয়ে করে ঝামেলায় পড়ে জ্যাঠামশায় বলরামের দ্বারা
সমস্যামুক্ত হওয়া কৃষ্ণপুত্র শাম্ব । সেই শাম্ব যিনি শ্রীকৃষ্ণের দেহরক্ষী বাহিনীর
প্রধান এবং কুরুক্ষত্রের যুদ্ধের এক মহারথী সাত্যকীর সঙ্গে এক অকারন ক্ষমতা দ্বন্ধে লিপ্ত
হয়েছিল। সেই শাম্ব যিনি বৈমাত্রেয় ভাইয়েদের সাথে অহরহ
কলহে জড়িয়ে থাকতেন (মুল কারন অবশ্য অন্য ছিল । সাধারন মানুষ চাইতো শ্রী কৃষ্ণ এবং রুক্মিনীর পুত্র
প্রদ্যুম্নকে প্রাধান্য দিতে কিন্তু শাম্ব তা হতে দিতে চান নি। ফলশ্রুতি
আভ্যন্তরীন কলহ)।সেই শাম্ব যিনি কলহকে মারাত্মক রুপে প্রকাশ পেতে অগ্ৰনী ভূমিকা নিয়েছিলেন ।সেই হতভাগ্য পুত্র তিনি তার পিতার দ্বারা শাপভ্রষ্ঠ
হয়ে ভয়ানক কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অভিশাপগুলি সব ফলে গিয়েছিল।যদুবংশ
ধ্বংস হয়েছিল। নাশের মূলেও কিন্তু ছিল অভিশাপ।আজ সেই শাম্বের কথা বলবো যিনি অযাতীতভাবে অভিশপ্ত
হয়েছিলেন । মহাভারত স্রষ্টার ইচ্ছানুযায়ী যুক্তিহীন ভাবেন তিনি উপেক্ষিতই হয়েছিলেন ।
যাক, সবার আগে প্রথম অভিশাপের ঘটনাটি কি ছিল তা সংক্ষেপে বলে নিই...
"একবার বিশ্বামিত্র, কণ্ব ও নারদ মুনি দ্বারকায়
গেলে যাদবগণ কুবুদ্ধিবশত: কৃষ্ণপুত্র শাম্বকে পেটে কাপড় বেঁধে গর্ভিনী-বেশে
সজ্জিত করে ঋষিদের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন যে, ইনি বভ্রুর স্ত্রী, এঁর কি সন্তান হবে? মুনিরা প্রতারণা ধরতে পেরে ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন যে শাম্ব এক লৌহমুষল প্রসব
করবে, যদ্দারা যদুবংশ ধ্বংস হবে। পরদিন শাম্ব এক লৌহমুষল প্রসব করেন এবং যাদবগণ সেই
মুষলচূর্ণ করে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন। (পৌরাণিক অভিধান ১৪১২: ১২৪, ৫০৩)"।
পুরাণ বর্ণিত দ্বারাবতীতেই(দ্বারকা নামেও অভিহিত,সমুদ্রের উপকূলে সম্ভবত শ্রীকৃষ্ণ নির্মাণ করিয়েছিলেন,যার অস্তিত্ব আজ আর নেই হয়ত, সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ায় সম্ভাবনাই প্রবল)শাম্বের বেড়ে ওঠা, যোদ্ধা হয়ে ওঠা। রাজনীতির পাঠ, অভিশপ্ত হওয়া সবই ঐ দ্বারাবতী নগরীতে।উজ্জ্বল বর্ণ ,সুদর্শন,চিত্তজয়ী দুর্বার আকর্ষণ , বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ এরূপ গুণান্বিত শাম্ব রূপে, গুণে ছিলেন যাদব কুলশ্রেষ্ঠ। রাজনীতিতেও শাম্বের গুরুত্ব সেইসময়ে অপরিসীম ছিল । মুনিদের অভিশাপে অভিশপ্ত হয়েএ একদিন একটি লোহার মুষল প্রসব করলেন
শাম্ব। এরপর ঘটে যায় নানা ঘটনা। শ্রীকৃষ্ণ এবং বলরাম তখন নগরীতে ছিলেন না। ফিরে এসে প্রথমেই তো তাঁরা চূড়ান্ত ক্রুদ্ধ হন। তারপর মুষলটি চূর্ণ করে সমুদ্রে ফেলার নির্দেশ
দেন। কিন্তু সেই সমুদ্র তীরেই জন্মায় নল - খাগড়ার গাছ এবং পরবর্তীতে দেখা যায়
যদুবংশীয়েরা সেই গাছের কাণ্ড নিয়ে যখন নিজেদের মধ্যে মারামারি করছিল, সেই কাণ্ডগুলোই মুষলে পরিণত হয়ে যাচ্ছিল। শাম্বের প্রসব করা সেই মুষলই শেষ
অব্দি যদুবংশের ধ্বংসের কারণ হয়েছিল।
লক্ষণার সাথে বিবাহ পর্ব
স্বয়ংবরে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে
শাম্ব লক্ষ্মণার রূপে বিমোহিত হয়ে তাকে নিয়ে হস্তিনাপুর থেকে দ্বারাবতীর উদ্দ্যেশ্যে
বেরিয়ে পড়েছেন। বিষয়টি
জানাজানির পর কৌরবরা ক্ষুব্ধ হয়ে শাম্বকে তাড়া করে। কর্ণ ইন্দ্রজাল অস্ত্র প্রয়োগ করে শাম্বকে বেঁধে ফেলে এবং বন্দী করে(আধুনিক যুগের ইন্টারনেট প্রযুক্তির সাহায্যে উন্নত ট্রাফিক সিকিউরিটি
সিষ্টেমের তুলনা চলে) । যা
জানতে পেরে যাদব কুলপতিরা শাম্বকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসে। যাদব ও কৌরবদের মধ্যে
আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার কারণে শ্রীকৃষ্ণের দাদা বলরাম শান্তিপূর্ণ এবং
পারিবারিকভাবে সমস্যার সমাধান করতে হস্তিনাপুর যান। হস্তিনাপুর গিয়ে বলরাম বলেন, মথুরার যাদবদের রাজা উগ্রসেন শাম্বকে মুক্তি দিতে অনুরোধ করেছেন কিন্তু কৌরবরা
সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। উপরন্তু বলরামকে সেই সভায় অপমান করা হয়। এতে বলরাম
চরম ক্ষুব্ধ হন। ক্রোধে উন্মত্ত অবস্থায় বলরাম পায়ের গোড়ালি দিয়ে বসুধা
বিদারিত করেন এবং বলেন যে, হস্তিনাপুরকে কৌরবসহ গঙ্গায়
নিক্ষেপ করবেন। তিনি তাঁর হল বা লাঙ্গল নিক্ষেপ করে হস্তিনাপুরের প্রাকারে টান
দেন। শহর হঠাৎ ঘুরছে দেখে কৌরবরা তৎক্ষণাৎ বলরামের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
তারপর বলরাম হস্তিনাপুর শহরটিকে তার আসল অবস্থানে ফিরিয়ে আনেন। অবশেষে শাম্ব
মুক্তি পায় এবং লক্ষণার সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়(বলরামের এই বিদ্যা এখনও সম্ভবত আধুনিক বিশ্ব আবিস্কার করতে এখনও পারে নি বলে আমার
ধারনা)।
অভিশাপ ও রোগ এবং রোগমুক্তি
"একবার মহর্ষি নারদ তাঁর কয়েকজন শিষ্য সহ দ্বারকায় আগমন করেন। তাঁর আগমন
সংবাদ পাওয়া মাত্র কৃষ্ণ এবং তাঁর বংশধরেরা সহ দ্বারকার প্রত্যেক যদুবংশীয়
ব্যক্তি এসে তাঁকে অভ্যর্থনা করেন। কিন্তু শাম্ব তখন পার্শ্ববর্তী একটি কাননে
কয়েকজন রমণীর সাথে প্রেমালাপে রত থাকায় নারদের প্রতি অবহেলা করেন। শাম্বর এই
আচরণে অপমানিত বোধ করে নারদ তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ার সংকল্প করেন। তিনি কৃষ্ণের সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ করলেন যে নরকাসুরের কারাগার থেকে
উদ্ধার হওয়া কৃষ্ণের ষোল হাজার রমণী শাম্বের প্রতি আসক্ত। কিন্তু কৃষ্ণ নারদের
অভিযোগ অবিশ্বাস করে বললেন যে তাঁর প্রতি ষোল হাজার স্ত্রী সহচরী রমণীদের একনিষ্ঠ
প্রণয় বিষয়ে তাঁর মনে কোন দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব নেই এবং শাম্বের বিশ্বস্ততা ও
পিতৃভক্তিও প্রশ্নাতীত। এই কথা শুনে এবং শাম্বকে দণ্ড দিতে না পেরে দেবর্ষি নারদ
আরও ক্রুদ্ধ হলেন।
কিছুকাল পরে আবার দ্বারকায়
ফিরে এলেন। তখন এসে প্রথমেই তিনি রৈবতক পর্বতের গভীরে গেলেন যেখানে কৃষ্ণের প্রমোদকানন রয়েছে।। সেখানে গিয়ে দূর থেকে নারদ
দেখলেন যে কৃষ্ণ, তাঁর মহিষীগণ ও ষোল হাজার
রমণীদের সঙ্গে সুখে জলকেলিতে মগ্ন। কৃষ্ণকে ঘিরে বিভিন্ন রমণী নানা ক্রীড়াকৌতুকে
ভেসে বেড়াচ্ছে। । নারদ লক্ষ্য করলেন যে সুরাপানে আসক্ত রমণীদের বসনভূষণের শৈথিল্য
ও নগ্নতার বিষয়ে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই কারণ রৈবতকে অবস্থিত সেই প্রমোদ উদ্যান ও
সরোবরে একমাত্র কৃষ্ণ ছাড়া অন্য কোনও পুরুষের উপস্থিতির কোন উপায় নেই। দ্বারকায়
এইকথা সর্বজনবিদিত যে কৃষ্ণের প্রমোদকানন ও জলকেলি স্থান একমাত্র কৃষ্ণ ছাড়া আর
সকল পুরুষের অগম্য। কেবলমাত্র কোন বিশেষ প্রয়োজন বোধ করলে কৃষ্ণ স্বয়ং সেখানে
কাউকে ডেকে আনতে পারেন। রমণীদের সাথে কেলিতে মত্ত কৃষ্ণকে দেখে নারদ ছলনাপূর্বক
শাম্বকে গিয়ে সংবাদ দিলেন কৃষ্ণ তাঁর প্রমোদ উদ্যানে শাম্বকে ডেকে পাঠিয়েছেন।
অন্য সকলের মত শাম্বও জানতেন যে সেই প্রমোদকাননে কৃষ্ণ ছাড়া আর কারও প্রবেশাধিকার
নেই। কিন্তু নারদের ছলনায় প্রভাবিত হয়ে তিনি ভাবলেন যে সত্যিই কৃষ্ণ তাঁকে ডেকে
পাঠিয়েছেন। তাই তিনি দ্রুত সেখানে উপস্থিত হলেন। রমণীদের সাথে জলক্রীড়ারত কৃষ্ণ
শাম্বকে সেই কেলিস্থলে দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হলেন। কিন্তু তাঁর ষোল হাজার রমণীকুল
শাম্বকে দেখে সহসা উল্লসিত হয়ে উঠল। ক্ষণিকের জন্য তারা শাম্বের প্রতি আসক্তি বোধ
করল। যে রমণীদের জীবনে একমাত্র পুরুষ কৃষ্ণ ছাড়া আর কারও স্থান নেই সেই রমণীরা
স্বয়ং বাসুদেবের সামনেই অপর পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার স্পর্ধা দেখানোয় তাঁর
ক্রোধানল প্রজ্জ্বলিত হল। পরমুহূর্তেই কৃষ্ণ ক্রোধে ও গ্লানিতে তাঁর রমণীদের প্রতি
জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন ও তাদের শাপ দিলেন যে তাঁর মৃত্যুর পর তারা তস্কর
দ্বারা লাঞ্ছিত হবে। এরপর তিনি ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে শাম্বকে অভিসম্পাত করলেন যে
শাম্ব কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত হবে। তখন বিস্মিত ও আতঙ্কিত শাম্ব কৃষ্ণকে অনুনয় বিনয়
করে বোঝালেন যে তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর প্রমোদকাননে আসেননি। তখন কৃষ্ণ প্রকৃত সত্য
অনুধাবন করতে পেরে শাম্বকে বললেন যে, দেবর্ষি নারদই একমাত্র তাকে মুক্তির দিশা দেখাতে পারেন। তিনি তাকে কোনপ্রকার
অভিশাপ দেননি, এটা আসলে শাম্বের ললাটলিখন।
জন্মকুণ্ডলী অনুযায়ী শাম্বের কুষ্ঠরোগ হবেই এবং সেই সময় এখন আগত। তিনি শুধু
ভবিতব্যকে উচ্চারণ করেছেন মাত্র। এরপরে শাম্ব দ্বারাবতী নগরী ত্যাগ করে নগরের
বাইরে একাকী অবস্থান করেন এবং অপেক্ষা করতে থাকেন সেই বেদনাক্লিষ্ট ভবিষ্যতের। নারদের পরামর্শ মত চন্দ্রভাগা নদীর তীরে অবস্থিত সূর্যক্ষেত্রের মিত্রবনে
গিয়ে এক মহাপ্রভঃ ঋষির সাক্ষাৎ পান।তাঁর উপদেশ অনুযায়ী শাম্ব এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে সূর্যদেবের কৃপা প্রার্থনা
করেন। ভারতের পূর্ব উপকূলে সমূদ্রতীরে অবস্থিত মৈত্রেয় বনে দীর্ঘ ১২ বছর কঠোর
তপস্যা করেন শাম্ব। শাম্বের তপস্যায় প্রসন্ন হয়ে সূর্যদেব তাকে রোগমুক্তির বর দেন। সাগর ও চন্দ্রভাগার সঙ্গমে স্নান করে চিরতরে রোগমুক্তি হয় তার(চন্দ্রভাগা নদীটির এখন আর অস্তিত্ত্ব নেই)। এরপর নিরোগ শাম্ব স্নান করতে নেমে চন্দ্রভাগা সঙ্গমে সূর্যদেবের একটি বিগ্রহ
পান। তখন থেকেই সূর্যদেবের মূর্তিপুজোর প্রচলন হয় মর্তলোকে। এই মৈত্রেয়ী বনই হল
অর্ক বা সূর্যক্ষেত্র যা আজকে কোণারক নামে পরিচিত। শাম্বকেই ‘শাম্ব পুরাণে’ ব্যক্ত করা হয়েছে ‘বিবস্বান’ বা সূর্য বলে।
পুরাণের নানা পল্লবিত কাহিনিতে
শাম্ব নানা ভাবেই চিত্রিত। মহাকাব্য শাম্বকে
যুক্তিযুক্ত মর্যাদা দেয় নি। পিতার প্রতি বিদ্বেষ বা অভিমান যাই থাকুক না কেন, শাম্ব সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ঘটনা― মুষলপ্রসব ও যদুবংশ ধ্বংসের একজন কান্ডারী হিসেবে। কিন্তু
এই যদুবংশ ধ্বংসের জন্য দায়ী ব্যক্তিটিকেই কালকূট (সমরেশ বসু)ভিন্নভাবে রূপায়িত করেন। সেই
কাহিনিতে শাম্বের লক্ষ্মণাহরণ বা মুষলপ্রসব নয় বরং প্রাধান্য পায় পাপ ও
শাপমুক্তির আখ্যান। পুরাণ-ভাঙা সেই নবকাহিনির নায়ক শাম্বও অভিশপ্ত। কিন্তু
পরিণামে পাপ-আত্মোপলব্ধি ও মুক্তিতে অনন্য চরিত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত। কালকূটের উপন্যাস তাই শাম্বকে নিয়ে নতুন ভাবে
ভাবতে শেখায়। অবশ্যই কখনও পড়বেন কালকূটের "শাম্ব"।

0 মন্তব্যসমূহ