মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসরঃ গল্প কারিগর / সাঁজবাতি


কারিগর

বিলাসপুর গ্ৰামে রায় বাড়ি একমাত্র বনেদী বাড়ি।বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়। বাড়ি ভর্তি লোকজন রক্ষনাবেক্ষনের জন্য।রায়বাড়ির কর্তা অধিরাজ রায়। 

ভীষন ভালো মানুষ।সকলের আপদে বিপদে সাহায্য র হাত বাড়িয়ে রাখেন সবসময়। তার একমাত্র মেয়ে রিক্তা। রিক্তা যখন খুব ছোটো তার মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়।তাই বাবা ভীষণ সচেতন তার ভালো মন্দ ,সুখ অসুখ নিয়ে। রিক্তা ভীষন আদর যত্নে মানুষ।ঘরোয়া সহজ ভীষন সরল মেয়ে।

বাবা গ্ৰামের মানি ব্যক্তি। সকলের জন্য তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে রাখেন সবসময়। রিক্তা পড়াশোনায় ভীষন ভালো ছিল ।রিক্তার বাবা মেয়েকে বলতেন কলেজ পাশ করলেই গ্ৰামে একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দেবেন। যেখানে রিক্তা পড়াবে।গ্ৰামের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে পারবে।

রিক্তার ও ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষিত হয়ে গ্ৰামের স্কুলে পড়াবে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা র জন্য শহরে আসতে হবে।

শহরে সে ভীষণ বেমানান।শহরের নাম শুনলেই তার মনে এক অজানা ভয় গ্ৰাস করতে আসত। উচ্চ মাধ্যমিকের পর গ্ৰামের স্কুলের পাঠ চুকিয়ে শহরে উচ্চ শিক্ষার জন্য আসতে হবে। সে ভাবে কীভাবে শহরের পরিবেশে সে মানিয়ে নেবে?একটা অস্বস্থি কাজ করতে থাকে তার মধ্যে। তার মাসি শহরে থাকে। খুব একটা মাসি বাড়িতে তার আসা হয়নি এর আগে।দু একবার এসেছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় তাকে আসতেই হবে। তাই সে নিজেকে মনে মনে প্রস্তুত করতে শুরু করে। কলকাতার একটা নামি কলেজে সে পড়াশোনা করার সুযোগ  পায়।

ঠিক হয় মাসির বাড়িতে থেকেই সে পড়াশোনা করবে। কিন্তু একটা অজানা ভীতি  তাকে ভীষণভাবে গ্রাস করতে থাকে। 

শহরের পরিবেশে এসে সে একদমই অভ্যস্ত নয়। সে কি পারবে শহুরে ছেলেমেয়েদের সাথে ,তাদের অভ্যাসের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে? সে গ্রাম্য পরিবেশে মানুষ এবং ভীষণ সহজ সরল। শহরের কিছুই সে জানে না, তাই অজানা একটা ভীতি তাকে সবসময় গ্রাস করতে  থাকে। সে কি আদৌ শহরে থেকে উচ্চ শিক্ষাটা চালিয়ে যেতে পারবে? এই অজানা ভয় তাকে বারবার গ্রাস করতে থাকে। যাইহোক অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে সে সেই ভয় কে কাটিয়ে অবশেষে কলকাতায় এসে মাসীর বাড়িতে থেকে কলেজের পড়াশোনা শুরু করল।

নতুন জায়গা নতুন পরিবেশ মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হল তার কিছুদিন।শহরের নিয়ম কানুন যে সেভাবে কিছুই জানেনা। তাকে ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল।  নতুন শহর ,নতুন কলেজ আধুনিক ছেলে মেয়ে সকলের সাজ পোশাক ভিন্ন রকম। 

রিক্তা ছিল ভীষণ সুন্দরী। একরাশ ঘন কালো চুল গায়ের রং ধবধবে পরিষ্কার। চোখ দুটো টানা টানা । কিন্তু সাজগোজ আধুনিক নয় সাজগোজের মধ্যে ছিল গ্রাম্য ছাপ। কথাবার্তায় ও ছিল গ্ৰাম্য একটা টান।

  শহরের ছেলেমেয়েদের আদব-কায়দার সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল ।প্রথম দিন কলেজে গিয়ে এসে দেখল তার সাজগোজের সাথে আধুনিকতার কোন মিল নেই এবং তার পারিপার্শ্বিক যারা রয়েছে তাদের সঙ্গে তার চাল চলন কথাবার্তা র ও কোন মিল নেই। তাই নিজেকে প্রচন্ড বেমানান মনে হতো শুরু করল সেই জায়গায় তার।

কলেজে তার সাজ পোশাক দেখে অনেকেই তাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করত ।তার কথা বলার ধরন দেখে অনেকেই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। এগুলো তাকে ভীষণভাবে  ভাবাতো সে বোধহয় মানিয়ে নিতে পারবে না সবটা। সে বোধহয় পড়াশোনাটা শহরে জীবনের সাথে মানিয়ে চালিয়ে যেতে পারবে না।

প্রাইভেট পড়তে গিয়েও বিভিন্ন বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়েছিল তাকে।সে ছিল শহরে একদম বেমানান।তবুও পড়াশোনায় জন্য মানিয়ে নিয়েছিল সবটা। মাসিকে একবার বলেছিল, যে আমি বোধহয় পড়াশোনাটা শেষ করতে পারবো না। আমার এখানে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। আমি হাজার চেষ্টা করেও সবটা মানিয়ে নিতে পারছি না।

মাসি বুঝতে পেরে একটা উপায় খুঁজে বার করলেন।বাড়ীতেই একজনক গৃহ শিক্ষকের ব্যবস্থা করলেন।তিনি এসে ওকে পড়াবে।শুনে রিক্তা স্বস্থি পেল। দেবরাজ ব্যানার্জি।পেশায় কলেজের শিক্ষক।বাড়িতে ছাত্রছাত্রীদের পড়ান।গ্ৰামের ছেলে।চাকরিসূত্রে শহরে বসবাস। 

 মাসির বাড়ির পাড়াতেই উনি থাকেন।  মাসির অনেক অনুরোধ  করার পরে উনি রাজি হয়েছিলেন বাড়িতে এসে পড়ানোর জন্য রিক্তাকে। স্যার যেদিন প্রথমদিন বাড়িতে এলেন, তাকে দেখে ই রিক্তার ভীষণ শ্রদ্ধা মনে হয়েছিল তার প্রতি ।

পরনে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি। বয়স বেশি নয় তবে চরিত্রের মধ্যে একটি দৃঢ়তা রয়েছে এবং ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একটা মানুষ। 

প্রথমদিন দেখেই রিক্তার মনে হয়েছিল কোন এক ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে তার ।স্যার ঠিক  তার মতই সহজ-সরল পোষাক আসাক মার্জিত কথাবার্তা। তার কাছে পড়তে রিক্তার একটুও অসুবিধা হবে না বলে প্রথম নজরেই তার মনে হয়েছিল।

রিক্তার মাসি স্যারকে সবটাই জানিয়ে ছিল যে ওর কি সমস্যা হচ্ছে ,কেন বাড়িতে এসে পড়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। স্যার ভালো পড়াতেন।রিক্তাকে বলতেন সমাজের ‌সাথে তাল মিলিয়ে চলতে। কিন্তু রিক্তা বড্ড গ্ৰাম্য।তাকে বলতেন , পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারাটাই জীবন।

স্যারের শব্দগুলো ছিল ভীষণ স্পষ্ট এবং যেটাই বলতেন ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলতেন। তার কথাগুলো রিক্তার যেন দৈব বাণী মনে হতো। সবসময় এগিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলতেন।সাজ পোশাকে সাবেকিয়ানার ঐতিহ্য হলেও মনটাকে আধুনিকতার ঢালে সাজিয়ে নেওয়ার কথা বলতেন। বলতেন মনের যা কিছু নেগেটিভিটি সেগুলোকে কাটিয়ে সবসময় পজেটিভ চিন্তাভাবনা করলেই জীবনে এগিয়ে চলা যাবে ।এগিয়ে চলার সঠিক মন্ত্র স্যার তাকে দিতেন। শিক্ষকের প্রধান ধর্ম সন্মন্ধে তাকে অবগত করতেন ।

কথাগুলো যেন সারাদিন তার কানে বাজত। স্যারের সাজ পোশাক কথাবার্তায়  সাবেকিয়ানার ছাপ। গ্রাম্যতার ছাপ থাকলেও তিনি ছিলেন মনের দিক থেকে ছিলেন ভীষণ আধুনিক। তিনি ভীষণ উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং তিনি একটাই কথা বলতেন শিক্ষার কোন শেষ নেই আজীবন আমরা কেবল শিখতে এসেছি শেখার কোন শেষ নেই।

 রিক্তাকে সবসময় বলতেন কিভাবে আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। তিনি এও বলতেন বাহ্যিক পোশাক আসাক কখনো আধুনিকতার পরিচয় দেয় না।মনটাকে আধুনিক করো। তুমি পারবে।আমি জানি তুমি পারবেই।

রিক্তাও জানেনা কবে  স্যার আদর্শ হয়ে উঠেছিল তার। বাবা-কে ছেড়ে গ্রাম্য পরিবেশ ছেড়ে নিজের বাড়ি ছেড়ে বেমানান শহরে যখন রিক্তা নিজেকে ভীষণ একা মনে করতে শুরু করল, তখন ওই স্যার কোথাও যেন তাঁর বন্ধু হয়ে উঠেছিল ।

তার সাথে ভালো মন্দ কথা সে ভাগ করতে শুরু করেছিল ।সে জীবনটাকে অন্যভাবে চিনতে শুরু করেছিল। কলেজের ভালোলাগা মন্দলাগা সে সবটাই বলতো স্যারকে। স্যার বলতেন, জীবনটাকে ছোট করে দেখো না। জীবনটা অনেক বড় ।ছোটো পরিধি পরিসীমার মধ্যে জীবনটাকে বেঁধনা। 

প্রথম বর্ষের পরীক্ষার ভীষণ ভালো রেজাল্ট করে ।রিক্তার বাবা তো শুনে ভীষণ খুশি ।মাঝেমধ্যে বাবা আসতেন মেয়ের সঙ্গে দেখা করে যেতেন। রিক্তা র খুব একটা গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয়নি। বছরে একবার যাওয়া হতো। পড়াশুনা নিয়ে ভীষণ নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। আস্তে আস্তে সমাজের সাথে সে নিজেকে পরিবর্তন করতে শুরু করে। 

কিন্তু সে গ্ৰাম্য চালচিত্র তার নিজস্বতার মধ্যে  বয়ে নিয়ে চলতে ভালোবাসতো ,আধুনিক বন্ধু-বান্ধবরা কেমন যেন তাকে ঠাট্টার চোখে দেখতো । তখন স্যারের কথা তার মনে পড়তো ।স্যার বলতেন, রিক্তা নিজস্বতাকে বয়ে নিয়েই যাওয়াটাই স্বতন্ত্রতা।সঠিক অর্থে আধুনিক হওয়া। মানসিকতা  আধুনিকতা হওয়াই যথাযথ আধুনিকতার পরিচয় দেয়।

পড়াশোনা করতে করতে স্যার হয়ে ওঠেন তার আদর্শ।মনে মনে কোথাও যেন একটা বড় আসন দিয়ে ফেলে তাকে। কিন্তু সে আসনের নাম কি তার জানা নেই।

কিশোরী জীবনের হয়তো প্রথম ভালোবাসা ।তার মনে গেঁথে যায়। পড়াশুনা করতে গেলে ওই একটা মুখেই তার সামনে ভেসে উঠতে থাকে। কিন্তু অপরপক্ষে মনের আলোডনের গতি ঠিক কোন দিকে ছিল সে কোনদিনই বুঝে উঠতে পারেনি।

এমনসময় একটি ভালো সন্মন্ধে র সন্ধান আসে তার।বাবা চিঠি পাঠান মাসিকে।বিয়ের পর পড়াশোনা করতে পারবে সে। এ খবর শোনা মাএ রিক্তা ভেঙে পড়ে।সে এখন ই বিয়ে করতে চায়না।আর তার মনের আসনে মে আছে তার জায়গায় অন্য কাউকে কি করে সে বসাবে? কিন্তু তার ও মনের সবটা জানা প্রয়োজন।

তাই একদিন সে ঠিক করলো নিজে থেকেই সে  মনের গতির দিক সে নির্ধারণ করতে চায়। একদিন একটি গীতবিতানের মধ্যে সে তার মনের সবটুকু লিখে একটি ছোট চিরকুট তার মধ্যে রেখে দিয়েছিল। আর ভেবেছিল সেই গীতবিতান তুলে দেবে। স্যারের হাতে। সেদিনটি ছিল একটা আনন্দের দিন ।হরতালের জন্মদিন।

সেদিন সন্ধ্যায়  সে অপেক্ষা করে বসে রয়েছে কখন স্যার আসবেন । বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। এক অস্থিরতা কাজ করছিল  তার মধ্যে।স্যার তাকে ঠিক যেভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল সেভাবেই সে ভেবেছিল।

ওর মনে হয়েছিল নিজের মনের কথাটা বলে দেওয়া উচিত। নিজের মনের কথাটা জানানো উচিত। যথারীতি স্যার এলেন বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। রিক্তা বলল, এই বৃষ্টির মধ্যেও আসতে হলো আপনাকে। স্যার বললেন কাজের সাথে আমি কোন কম্প্রোমাইজ করি না। 

 সেদিন একটি গীতবিতান তুলে দিল রিক্তা তার হাতে।। স্যার বললেন এটা আবার কি ? রিক্তা বলল আপনার জন্মদিনের উপহার স্যার। উনি বললেন বাঃ ভীষণ ভালো উপহার তো ।

এর থেকে ভালো উপহার আর তো কিছু হয় না। খুলে দেখতে গেলে, রিক্তা বলল এখন খুলবেন না ,বাড়ি নিয়ে গিয়ে তারপর খুলবেন। স্যার বললেন আচ্ছা বেশ। সেদিন পড়াশোনা শেষ করে স্যার বেরিয়ে গেলেন।

রিক্তা পরদিন সন্ধ্যের অপেক্ষা করতে থাকলো কখন সন্ধ্যে নামে এবং স্যারের উত্তরটা সে জানতে পারবে। কিন্তু সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হয়ে যায় স্যার আসেন না । তার চিন্তা হলো । মাসিকে বলল একটা খবর নিতে মাসি ফোন করল কিন্তু  ফোন রিসিভ করল না কেউ। 

পরদিন সকালে রিক্তা স্যারের বাড়িতে গেল, গিয়ে দেখল   স্যারের বাড়িতে তালা দেওয়া। স্যার নেই পাশের একজন বলল স্যার গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন কাল রাতে।

কিন্তু কারণটা রিক্তা বুঝতে পারল না। যদি স্যারের কোন রকম কিছু বলার থাকতো তো সেটা পরিষ্কার করেও পারতেন তিনি।  না হয় সে একটা ভুল করে ফেলেছিল আবেগের বসে । কিন্তু সেখান থেকে যখন কোন উত্তর পেল না ভালো খারাপ কোন উত্তর ই পেল না, তখন নিজের কাছে নিজেকে অপরাধী বলে মনে হতো শুরু করল। বাড়িতে ফিরে রিক্তা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল।

 মাসি বুঝতে পারেনি তার মনের অবস্থা। তাকে  জিজ্ঞাসা , করেছিল যে কি হয়েছে তার । কিন্তু সে কিছু বলতে পারেনি। শুধু কেঁদেছে।

নিজেকে ঘরের মধ্যে বন্ধই রাখত সারাদিন।আর নিজেকে দোষারোপ করত । হঠাৎ বাড়িতে একদিন একটি বিবাহের কার্ড আসে  ।তাতে বড় বড় করে কিছু লেখা আছে । সেটা রিসিভ করে রিক্তা। তার মধ্যে যা লেখা রয়েছে তা খুলে দেখে রিক্তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায় ।

লেখা রয়েছে তার স্যারের বিয়ের কার্ড। গ্রামের বাড়িতে আগামী ১৫ই জুন ।তাই মাসিদের নেমন্তন্ন করেছেন। মাসি এসে বলল কে এলো রে ?

কার্ডটা মাসির হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে সেখান থেকে চলে গেল। একটা সরল মেয়ের মনের কথা একটা পরিণত মানুষ বুঝতে পারেনি। যে মানুষটা মেয়েটাকে তৈরি করেছে মেয়েটাকে দু বছর ধরে দেখেছে, দু'বছর ধরে চিনছে সে মেয়েটার মনের কথা সে একবারের জন্য বুঝতে পারল না।

এটা কখনোই সম্ভব নয়। সেটা কি পড়েছিল চিঠিটা ? রিক্তার মনে একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরতে থাকে ।সে ভাবতে থাকে,  চিঠিটা পরে কি সে এরকম ভাবে দূরে সরে গেল নাকি চিঠিটা না পড়েই সে দূরে সরে গেল।

কোনটা ভুল কোনটা ঠিক তার মাথার মধ্যে কিছু এলো না। সে শুধু নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করল ।কিন্তু এভাবে কিছু না বলে দূরে কেনো চলে গেল।

 যে মহান মানুষটাকে পাশে পেয়েছিল ,যে বন্ধুটাকে সে পাশে পেয়েছিল যে তাকে জীবনে গড়ে উঠতে সাহায্য করল সেই মানুষটা একটা কথা না বলেও কেন দূরে চলে গেল? কি কারণ সেই কারণটা যে খোঁজ করতে শুরু করল। পারলো না কিছুতেই। রিক্তার কাছে কিছু পরিষ্কার হলো না ।
নিজেকে নিজের ভীষণ ছোট মনে হতে শুরু করল। সে মাসি কে বলল সে আর শহরে থাকতে চায় না।তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

সে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে চায়। মাসি বলল তোর সামনে আর একটা বছর । সামনে পরীক্ষা দুটো বছর ভালো কাটালি। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করলি ।আর শেষের বছরের পরীক্ষাটা দিবি না ?

তোর গ্রামের বিদ্যালয় পড়ানোর কথা। তুই যদি কলেজ থেকে পাস না করিস , তবে কি করে তুই শিক্ষিকা হয়ে পড়াবি বাচ্চাদের? তোর স্বপ্ন পূরণ তুই করবি না ?

কিন্তু তার আর একটা মুহূর্ত তার থাকতে ইচ্ছে করল না। সে বলল,আমার এখানে দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি আর এখানে থাকতে পারছি না মাসি। আমাকে গ্রামের বাড়ি চলে যেতে দাও।

 তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে ইচ্ছে করলো, গ্রাম তাকে ভীষণভাবে টানছিল ।তার মনে হল শহরে  এত জটিলতা সে বেমানান ।শহরের সব জায়গাতেই জটিলতা। যে যাকে বিশ্বাস করল যাকে ভালোবেসে মনের কথাটা নির্দ্বিধায় জানালো সেই কোন কিছু না বলেই তার থেকে এত দূরে চলে গেল ।

সে কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। এই অপমান এ লজ্জা সে মেনে নিতে পারল না। শেষের বছরের পরীক্ষাটা সে না দিয়েই ঠিক করল সে ফিরে যাবে গ্রামে। একটা দিনও সে সেখানে থাকতে পারলো না। সে গ্রামে ফিরে এলো গ্রামে এসেও নিজেকে ঘর বন্দী করে রেখে দিল। 

পরীক্ষার আর দিন ১৫ বাকি ছিল। ফিরে আসতে দেখে তার বাবা চিন্তিত হয়ে বললেন, তুই পরীক্ষা না দিয়ে ফিরে এলি যে সামনে না তোর পরীক্ষা।বিয়ের কথা বলেছি বলে রাগ করেছিস? আচ্ছা বিয়ে করতে হবেনা তোকে।রিক্তা বাবাকে জড়িয়ে কেঁদে বলল,ওসব কিছু না বাবা।

  আমার আর ভালো লাগছে না আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে শহরে। আমাকে আর ফিরে যেতে বলোনা।বাবা জোর না করে বললেন, তোর যা ভালো লাগে তুই তাই কর। 

সে কিছুতেই শহরে ফিরতে চায় না তার ইচ্ছে তার স্বপ্ন সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মনে হলো মস্ত বড় কিছু একটা তার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। নিজের গ্রাম্য সরলতাকে সে আর মলিন করতে পারবো না।

তার বাবা বুঝতে পেরেছিল মেয়ে কোন কারনে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে কিন্তু কি কষ্ট সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলনা।  মা থাকলে হয়তো বুঝত। বাবা বললেন ঠিক আছে তোকে আর ফিরে যেতে হবে না।

কিছুদিন বাদে একদিন সকালবেলা রিক্তা নিজের ঘরে বসে এক মনে আকাশে দেখেছে। কিছু একটা ভাব ছিল, হঠাৎ একজন কেউ এসে বলল , বাইরের ঘরে একজন এসেছে তার সাথে দেখা করতে। 
রিক্তা বলল,যাও বাইরের ঘরে বসতে বলো আমি যাচ্ছি। সে এসে দেখল ,ধুতি পাঞ্জাবি পরা সেই মানুষটা পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন ।তার স্যার এসেছেন । তার কারিগর।

মানুষটিকে দেখে তখন ঠিক কি করবে বুঝতে পারল না সে। সে কাদবে না লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে নেবে। তার কাছে পুরো জগৎটা শূন্য মনে হতে শুরু করল ।
ঠিক কি  করা উচিত তার সামনে ।
উনি বললেন ,কেমন আছো? হঠাৎ শহর ছেড়ে গ্রামের চলে এলে যে !
পড়াশোনাটা শেষ করবে না?
স্কুলে পড়াবে না ?
তোমার স্বপ্ন !
রিক্তা  বলল ,না শহরটা বড্ড জটিল। আমি ভীষণ সরল সাদাসিধে।এত জটিলতায় আমি নিজের সরলতাটাকে হারিয়ে ফেলতে চাই না ।

স্যার আমি  এই ভালো ।আমার নদী ,জল ,আকাশ বাতাস এই নিয়ে আমি ভালো আছি। আমি শহরের ইট,কাঠ ,কংক্রিট এগুলো আমি চাইনা । 

 আমি এমনই। আমার  আপনার কাছে আমার ক্ষমা চাইবার আছে। স্যার বললেন কিসের ক্ষমা?

 রিক্তা বলল ,আপনাকে জন্মদিনে যে উপহারটা দিয়েছিলাম তা আমাকে ফিরিয়ে দিন। ওটা ভুল করে দিয়ে ফেলেছিলাম।

আমি ভুল করে ও উপহার দিয়ে ফেলেছিলাম।

 আমি বুঝিনি সে উপহার দেওয়ার অধিকার আমার নেই । আমি যদি জানতাম একবারও সে উপহার দেওয়ার অধিকার আমার নেই তবে সে অধিকার........... বলে কেঁদে ফেলল .......

স্যার সামনে এসে মাথায় হাত রেখে বললেন  উপহার বড় অমূল্য জিনিস। ও টা আমি যত্ন করে, আমার প্রিয় আলমারিতে তুলে রেখে দিয়েছি । যেখানে আমার সবথেকে প্রিয় বই গুলো রাখা। যে বইগুলো আমি রোজ একবার ছুঁয়ে দেখি সেখানে রাখা আছে। 

জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়। জীবনকে নিয়ে আমাদের চলতে হয়। যে উত্তরটি জন্য তোমার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তার কোন যথার্থ উত্তর ও মূহুর্তে আমার কাছে ছিল না ।

আমি ভেবেছিলাম তোমাকে উত্তরটা পরে দেব কিন্তু তার সুযোগ আমি পাইনি। সেদিন রাতেই বাড়ি ঢুকে দেখি টেবিলের উপর মায়ের চিঠিটা পড়ে রয়েছে। মায়ের শরীর ভালোনা। রাতারাতি চলে আসতে বলেছে।

 আমার বাড়ির পাশেই আমার  স্ত্রীর কুসুমের বাড়ি। বড্ড দুঃখী ও ।ছেলেবেলায় বাবা-মা মারা গেছে ।আমার মায়ের কাছেই মানুষ ।মা ওকে নিজের মেয়ের মতো দেখে। মা সেদিন চিঠিতে লিখেছিলেন তিনি অসুস্থ গ্রামের বাড়ি আসার কথা। আমি গ্রামের বাড়ি গেলে , আমাকে বলেছিলেন  ,বাবু আমার যদি কিছু হয়ে যায় ,তুই ওকে দেখিস। 

মেয়েটি পড়াশোনাও জানে না । অসহায়।সারাদিন রান্নাবান্না পুজো পাঠ এসব নিয়ে থাকে। মা বলেছিলেন ,তুই ওর মাথার উপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিস না কখনো । তাই হয়তো আমি সত্যিই পারিনি ওর মাথার উপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিতে।

কিছুক্ষণ চুপ করে র ইলেন স্যার ।কিছুক্ষন পরে বললেন.........

আমি তোমাকে মানুষ হতে দেখতে চেয়েছিলাম ।দেখতে চেয়েছিলাম আধুনিকের সমাজে তোমার মত সরল মেয়েও নিজের সরলতার ত্যাগ না করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তুমি প্রমাণ করো।

 মানুষের মত মানুষ হ ও। তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে আমি চেয়েছিলাম ।আমি চেষ্টা করেছিলাম আমার সমস্তটা দিতে ।

তুমি আমাকে সেদিন গীতবিতানে যে চিঠিটা দিয়েছিলে আমি সেটা পড়েছিলাম ।একটা মেয়ে অনেকটা ভালোবাসার পরেই কাউকে নিজের মনের কথাটা এত সহজ ভাবে বলতে পারে । কিন্তু আমার কিছু করার ছিলনা।

 সেদিন যদি আমি কুসুমকে বিয়ে না করতাম , তবে মা কষ্ট পেতেন বা শান্তি পেতেন না ।ওর কি হতো? ও কোথায় যেত ?আমি কি ভুল করেছি তুমি বলো ?

 যদি তুমি বলো আমি ভুল করেছি আমি মেনে নেব । 

আর যদি মনে হয়, যে না আমি ঠিক করেছি তাহলে ফিরে যাও শহরে পরীক্ষাটা দাও।
 নিজের স্বপ্ন পূরণ কর ।

আর একটা কথা মনে রেখো ভালোবাসার মানেই সবসময় প্রাপ্তি নয় ।ভালোবাসা মানে তুমি যে বইটাকে খুব ভালোবাসো, তাকে খুব যত্নে ,তাকে খুব কাছে রেখে দেওয়া। 

রোজ একবার করে আলমারি থেকে ওই বইটা আমি বার করি, রোজ ছুঁয়ে দেখি। রোজ পাতা উল্টাই।

 আমার পড়ার টেবিলে বসে রোজ পরি তোমার চিঠিটা । একবার করে। আবার চিঠিটা বইয়ের মধ্যে রেখে বইটা বন্ধ করে আলমারিতে তুলে রাখি ।এটাই ভালোবাসা রিক্তা।

 তোমাকে আমি  হয়তো সামাজিক জীবনের শিক্ষা দিয়েছি। কিন্তু আজ বোধহয় তোমাকে আমি ভালোবাসার একটা পাঠ শিখিয়ে দিলাম ।

 ঈশ্বর আমাদের দুজনের অদৃষ্টে হয়তো এটা ই লিখেছিলেন ।

প্রাপ্তিতেই সব সময় মে ভালোবাসার সার্থকতা পাবে তা তো নয় তোমাকে এতটুকুই বলার ছিল আমার ।

দেরি হয়ে যাচ্ছে ,ট্রেনের সময় হয়ে গেছে। আমি আসি ।

কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না রিক্তা । অঝোর ধারায় শুধু কেঁদে গেল । স্যার ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন। 

কিছুক্ষণ বাদে চোখ মুছে বাবাকে গিয়ে বলল ,আমি কলকাতায় ফিরে যাব বাবা পরীক্ষাটা আমি দেব ।
বাবা বললেন কে এসেছিল রে ? রিক্তা বলল স্যার এসেছিলেন ।

পরীক্ষা দেব না শুনে জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলেন কেন ?
বাবা বললেন, তাহলে খুব ভালো স্যার বলতে হয় যার জন্য তুই নিজের মত বদলালি ......
তোকে খুব ভালোবাসে........

 রিক্তা বলল হ্যাঁ বাবা আমাকে খুব ভালোবাসে ।

 বলে ভিতরের ঘরে চলে গেল ।

কয়েক মাস বাদে.........

পরীক্ষায় পাশ করে রিক্তা ফিরে আসে গ্রামে ।

 স্যারের সাথে আর কোনদিনও তার কথা হয়নি। যোগাযোগ হয়নি।

বর্তমানে গ্রামের বিদ্যালয় শিক্ষিকা সে।

বাচ্চাদের পড়ায় । বাবা তার জন্য একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছেন । সে স্কুলের নাম দিয়েছে "দেবালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান "।

বাবাকে বলেছে, কোনদিনও সে বিয়ে করবে না ।বিয়ের জন্য অনেক সমন্ধে দেখেছে‌।কিন্তু বিয়ে করতে চাইনি রিক্তা ।

সে একজন মানুষ গড়ার কারিগর কেই ভালোবেসে ফেলেছিল।

 তার কিছু স্মৃতি আঁকড়ে ধরে,তার বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চায়।  আর কোনদিনও স্যারের সাথে তার দেখা হয়নি তার।

 বা কেউ কাউকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি কিন্তু যে কটা কথা তিনি বলেছিলেন, রিক্তা সবকটা কথা উপলব্ধি করতে পেরেছিল ।

বুঝতে পেরেছিল ভালোবাসার অর্থ ।শুধু পড়াশোনাই শিক্ষা নয়। জীবনের সবথেকে বড় শিক্ষাটা বোধ হয় তাকে দিয়ে গিয়েছিলেন স্যার।

 তার সাফল্য র সবটুকু তার স্যারকে সে উৎসর্গ করে দিয়েছিল।তার ছাত্রছাত্রীদের বলেছে ,আজ  সে যা বা যা কিছু সবটাই সেই কারিগরের জন্য। 

এটাই বোধহয় তার সব থেকে বড় গুরু দক্ষিণা ছিল ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ