মহাকাব্য ,পুরাণ চর্চাঃ পর্ব-৭
হিড়িম্বা: রাক্ষসী তো নন,তিনি দেবী / প্রবীর দে
আদি পর্বের মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত বারণাবত অজ্ঞাতবাসপর্ব...
পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার প্রচেষ্টা করলেন দুর্যোধন।, বিদুরের সহায়তায় পাণ্ডবরা গেলেন পালিয়ে। সে সময় তাঁরা এক বনে প্রবেশ করলেন,, যেখানে বাস ছিল রাক্ষস হিড়িম্ব এবং তাঁর বোন হিড়িম্বার। এদিকে হিড়িম্ব খবর পেলেন জঙ্গলে মানুষ এসেছে। তারই সন্ধানে হিড়িম্ব পাঠালেন বোনকে। যতুগৃহ থেকে পলায়নের পর বনের মধ্যে পঞ্চপান্ডব ও কুন্তী ঘুমোচ্ছিলেন।ভীম তাঁদের কে পাহারা দিচ্ছিলেন। হিড়িম্বা মধ্যম পাণ্ডব ভীমকে দেখে প্রেমে পড়ে গেলেন। রাক্ষসী তখন সুন্দরী নারীর রূপ ধারণ করলেন এবং বিয়ে করতে চাইলেন ভীমকে। এদিকে বোনের দেরি দেখে হিড়িম্ব উপস্থিত হলেন সেখানে, বোনকে এহেন আচরণ করতে দেখে তাঁকে মারতে উদ্যোগী হলেন ।ভীম হিড়িম্বকে দুহাতে তুলে ঘুরিয়ে মাটিতে ফেলে বধ করলেন।বাহুযুদ্ধের শব্দে কুন্তী ও অন্য পাণ্ডবরা জাগ্রত হয়ে সবকিছু দেখলেন।তখন সকলে চলে যাচ্ছেন ঐস্থান থেকে। হিড়িম্বাও সঙ্গ নিলেন। হিড়িম্বা কুন্তীর পায়ে প্রণাম করলেন। কুন্তি তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে ,হিড়িম্বা বলেন তিনি একজন রাক্ষসী এবং তার পুত্র ভীমকে বিবাহ করতে চান।কিন্তু ভীম হিড়িম্বাকে কোনোভাবেই বিবাহ করতে রাজি হলেন না। ভীম সম্মত হলেন না কারন তিনি ভাবছিলেন হয়ত হিড়িম্বা তার ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নেবেন। এজন্য তিনি হিড়িম্বাকেই হত্যা করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির তাকে স্ত্রীহত্যা করতে নিষেধ করেন। কাশীরাম দাস এর বর্ণনা ছিল অত্যন্ত নিপূণ ......দু চার লাইন না হয় শোনাই...
হিরিম্বা কুন্তীরে কহে হইয়া কাতর।।
কায়মনোবাক্যে মোর সত্য অঙ্গীকার।
তোমা বিনা গুরু মোর গতি নাহি আর।।
তোমারে না ভুলাইব প্রপঞ্চ বচনে।
স্ত্রীলোকের কর্ম্মপীড়া জানহ আপনে।।
কামবশ হৈয়া আমি অজ্ঞান হইনু।
আপন কুলের ধর্ম্ম ভ্রাতৃ ত্যাগ কৈনু।।
সব ত্যজি ভজিলাম তোমার নন্দনে।
এক্ষণে অনাথা আমি নিলাম শরণে।।
শরণাগতেরে ক্রোধ না হয় উচিত।
আপনি করহ দয়া দেখিয়া দুঃখিত।।
এরপর ,হিড়িম্বা কুন্তীর কাছে গিয়ে বলেন তিনি ভীমকে না পেলে আত্মহত্যা করবেন। তখন কুন্তীর আদেশে ভীম হিড়িম্বাকে বিবাহ করেন। যুধিষ্ঠির এই শর্ত দেন যে ভীম স্নান আহ্নিক শেষে হিড়িম্বার সাথে মিলিত হবেন এবং সন্ধ্যায় পুনরায় ভ্রাতাদের কাছে ফিরে আসবেন। সন্তান না হওয়া পর্যন্ত ভীম হিড়িম্বার সাথে বাস করতে রাজি হন। পরে ভীম ও হিড়িম্বার এক বীর ও বিদ্বান পুত্রসন্তানও হয়। নাম তাঁর ঘটোৎকচ।
নির্বাসন পর্ব সমাপ্তি ঘটলেও পান্ডবরা যখন চলে গেলেন ওখান থেকে । ,হিড়িম্বা কিন্তু ওঁদের সাথে যান নি।এরপর থেকে বাকি জীবন হিড়িম্বা ধ্যান,তপস্যা,ঘটোৎকচকে বড় করা পুত্রের ,চরিত্র গঠন করা,সুশিক্ষা প্রদান করা,ঘটোৎকচকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন ।এমনকি ঘটোৎকচের পুত্র বারবারিককেও মহান বীর ,জ্ঞানী হিসেবে গড়ে তুলতে অসাধারণ পরিচালনার সাক্ষর রাখেন।তাঁর এই তপস্যা,নিঃশর্ত ঈশ্বর সাধনা,যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাদর্শন , দেশপ্রেম, ভালোবাসার জন্য আত্মত্যাগ হিন্দু মানবগোষ্ঠীর কাছে তাঁকে রাক্ষসী থেকে থেকে দেবীর আসনে উপনীত হতে সাহায্য করেছিল।
হিমাচল প্রদেশে আজও হিড়িম্বা মন্দিরের সন্ধান পাওয়া যায। সেখানে পূজিতা হন রাক্ষসী হিড়িম্বা। ভাবলে হয়ত একটু অবাকই হতে হয়। রাক্ষসী থেকে দেবী হয়ে ওঠা এক দীর্ঘ তপস্যার ফল। হিমাচলের সাজানো শহর মানালি। মানালি শহর থেকে দু'কিমি দূরে বশিষ্ঠ আশ্রমের কাছেই হিড়িম্বার মন্দির (সম্ভবত তৈরি হয়েছিল ১৫৩৩ সালে) রাক্ষসী নন, শত শত বছর ধরে ‘মা’ হিসেবেই মানালির এই মন্দিরেই পূজিত হয়ে আসছেন ভীম পত্নী হিড়িম্বা।স্থানীয়দের বিশ্বাস আজও হিড়িম্বা মা আপদে বিপদে রক্ষা করে চলেছেন তাঁদের। রক্ষা করছেন গোটা অঞ্চলকে।
প্রশ্ন হচ্ছে কারা মানুষ ,কারা দেবতা ,কারা রাক্ষস?শ্রেণিবিভাজনে উন্নততর প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে বিচার্য্য বিষয় কি কি....!এ প্রশ্নের উত্তর হয়ত পাওয়া সম্ভব দিবি -আরোহণ তত্ত্বে।দিবি আরোহণ হল জ্ঞান।মানুষের কর্মযোগে দেবত্ব লাভের পথ হল 'দিবি আরোহণ'।দিবি আরোহণের সূত্র অনুযায়ী, 'ইন্দ্র একাধিক ,সকল ইন্দ্র ই প্রথমে মানুষ ছিলেন, পরে দেবতা ,তারপর জ্যোতিষ্ক(সূর্য)।এই সূত্র না মানলে ঋকবেদের ইন্দ্র বিষয়ক সব সূক্তোগুলির অর্থ বোঝা যায় না। তাহলে রাক্ষসীও তার আচরণ ,জ্ঞান-সাধনা,স্বতঃগুণের অধিকারী হয়ে নিজেকে শ্রেণি-উন্নিত করতে পারেন না।
মনু বলে গেছেন , মনুবংশীয় মানুষ ছাড়াও আরও যে বিভিন্ন জাতি রয়েছেন , তাঁরা হলেন --দেবতা,অসুর গন্ধর্ব,সর্প,নাগ, সিদ্ধ ,যক্ষ,রক্ষ।অসুরেরা ছিলেন দেবতাদের জ্ঞাতি ও বন্ধু। অসুরদের সৃষ্টি হবার আগে ,তারপরে দেবতা ও অন্যান্য রা।মনুর শ্রেণিবিভাজনে হয়ত রাক্ষস কে অন্তর্তভুক্ত হয় নি ,তবে হিড়িম্বার আচরণ গত শ্রেণি বিবর্তন ,সব তত্ত্বকে অতিক্রম করে নিয়ে গিয়ে যুক্তিবাদী সিদ্ধান্ত গ্ৰহনে অনুপ্রাণিত করে। ঘটোৎকচ ও বারবারিক এর প্রকৃত জ্ঞানী,যুক্তিবাদী,বীর, দেশপ্রেমিক এবং উত্তম মনুষ্যতুল্য জীব হয়ে ওঠার পিছনে হিড়িম্বার অবদান ই তাঁকে তাঁর শ্রেণি-উন্নতিকে সুনিশ্চিত করেছে। রাক্ষসী হয়ে জন্মেও কর্মফলে তিনি দেবী র স্তরে নিজেকে উথ্থিত করেছেন এই দিবি আরোহনের দ্বারা।
পুনশ্চ: হিড়িম্বা বিষয়ক আমার বিস্তৃত প্রবন্ধ লেখা সম্পূর্ন হয়েছে । তাঁর গল্লটি বিস্তৃতভাবে শোনাবো অন্যত্র।সে প্রবন্ধটি আরও কিছু দিনপর প্রকাশিত হবে আমার লেখা প্রকাশিতব্য বই--...."মহাকাব্য ও পুরাণের উপেক্ষিত চরিত্রগণ" প্রবন্ধ সংকলনে।
সূত্র:
কাশীদাসী মহাভারত
পৌরাণিক অভিধান - সুধীরচন্দ্র সরকার

0 মন্তব্যসমূহ