মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসর- ধর্ম চর্চা পর্ব-৫ঃআল লাত, আল উজ্জা,আল মানাত-আরবের তিন দেবী / প্রবীর দে



আল লাত, আল উজ্জা,আল মানাত-আরবের তিন দেবী / প্রবীর দে

আরবীয় ধারণা অনুযায়ী এবং কুরআনেরও উল্লেখ অনুযায়ী প্রাক ইসলাম যুগে আরবে মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল। প্রাচীন আরবের তিন দেবী (ইসলাম ধর্মগ্ৰন্থে তাঁদের "আল্লাহর কন্যা" বা "বানাত আল্লাহ"নামে উল্লিখিত করা হয়েছে) হলেন  আল-লাত, আল-উজ্জা এবং মানাত ।প্রাক-কুরআনের উৎস, কোরান এবং প্রাথমিক ইসলামিক উৎসে এঁদের কথা বলা হয়েছে। প্রাচীন আরবের পৌত্তলিকরা এই তিন দেবীকে  খুব  বিশ্বাস করত এবং এদের পূজা করত বলে ঐতিহাসিকদের মত। প্রাক-ইসলামিক যুগে কাবাঘরে সংরক্ষিত দেবতামূর্তি সমূহের মধ্যে তিনটি প্রধান দেবীমূর্তি হলেন আল-লাত, আল-উজ্জা এবং মানাত যাঁদেরকে  সর্বশক্তিমান আল্লাহ ( বা ভগবানের?) তিন কন্যা হিসেবে ধারণা করা হত।
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর জন্মের চারশো বছর পূর্বের কথা  একটু বলি তাহলে।তখনকার দিনে মক্কাকে বলা হত বেক্কা। সেই সময়েই হেজাজের সম্রাট কোহতান বংশের সাবা নামক এক ব্যক্তি  তাঁর বাড়ির ছাদে মূর্তি স্থাপন করেন। মোট স্থাপিত চারটি মূর্তির মধ্যে পূজনীয় মূর্তি হোবাল(ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার আগে, আরবদেশের একজন উপাস্য দেবতা) ছাড়াও বাকি তিনটি ছিল- আল্  লাত, মানাত ও উজ্জা। পরবর্তী ক্ষেত্রে কাবাঘরে মোট ৩৬০টি মূর্তি পাওয়া যায়। মনে করা হয় প্রতিটি গোত্রে ভিন্ন ভিন্ন দেবদেবী ছিল।আরবের ইতিহাসবিদরা মনে করেন   যে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তনের আগে  আরবে খ্রীষ্টান ও ইহুদী ধর্ম ছাড়াও আরও একটি ধর্ম ছিল।।এবং সেই ধর্মের লোকেরা  শুধু যে দেবদেবীর পূজো করতো তাই নয়। চাঁদ, তারা, নক্ষত্র, সূর্যের পূজোও করতো তারা। আসলে প্রকৃতি জগতের প্রতি সাধারণ মানুষের চিরকাল এক মোহ থাকেই। এই মোহ থেকেই ধর্মের সূচারু প্রভাব উঠে আসে দেব-দেবীর মাঝে। 
সেই রকমই দেবীরূপে তিনকন্যা হলেন আল লাত ,আল উজ্জা এবং মানাত।এই তিন দেবী কেই  সর্বশক্তিমানের কন্যা বলে মনে করতো কুরাইশরা। ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের বহু আগে কুরাইশ বংশ  ছিল আরবের একটি শক্তিশালী বণিক বংশ। এ বংশটি মক্কার অধিকাংশ অংশ আর কাবা নিয়ন্ত্রণ করত। এই কুরাইশ দের একটি অংশ পরে ইসলাম আগমনের সমর্থক হয়েছিলেন , আর  অন্য একটা অংশ কুরাইশ দের মধ্যে ছিল যারা ইসলাম আগমনের বিরোধিতা করেছিল। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধররা কিন্তু এই কুরাইশ বংশের অন্তর্গত। এ বংশ থেকেই মহানবী (সা.)-এর আগমন ঘটেছে।


আল  লাত
লাত অধিষ্ঠিত হয়েছিল তায়িফের কাছাকাছি পালমিরা নামক স্থানে। ইসলাম-পূর্ব যুগে মক্কাসহ সমগ্র আরব উপদ্বীপে এই দেবীর উপাসনা করা হতো। তাকে যুদ্ধ, শান্তি ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। সিংহ, গেজেল, অর্ধচন্দ্র এবং ঘনকাকৃতির পাথর হলো তার প্রতীক। এছাড়া সিংহ, গেজেল বা হরিণ এবং উট তার পবিত্র পশু হিসেবে বিবেচিত।এক হাতে খেজুর পাতাসহ সিংহের সাথে আল-লাতের প্রতিমূর্তি দেখা যায়। আরবের সংস্কৃতিতে বর্ষগণনা মূলত চন্দ্রকেন্দ্রিক। আল-লাতের প্রতীক ছিল চাঁদ। তাকে তিন দেবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ধরা হতো। তার প্রধান উপাসনা কেন্দ্র ছিল তায়েফের পালমিরাতে। সেখানে দেবী ‘লেডি অব দ্য টেম্পল’ হিসেবে পরিচিত ছিল। তাকে গ্রিক দেবী এথেনা এবং রোমান দেবী মিনার্ভার সাথে তুলনা করা হতো।দক্ষিণ আরবে আল-লাতের জনপ্রিয়তা না থাকলেও ধারণা করা হয় ইয়েমেনের আরব গোত্রগুলোর মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিল। এছাড়া পূর্ব আরবেও তার উপাসনা করা হতো।মক্কার হেজাজ অঞ্চলেও তার উপাসনা হতো এবং এই চর্চা সিরিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
আল উজ্জা
কুরাইশরা উজ্জাকে সর্বাপেক্ষা বেশি শ্রদ্ধা করতো। প্রাচীন আরবের প্রধান তিন দেবীর একজন আল-উজ্জা ছিল শক্তি, সুরক্ষা ও ভালোবাসার দেবী। তাকে গ্রিক দেবী আফ্রোদিতি এবং রোমান দেবী ভেনাসের সাথে তুলনা করা হয়। এই দেবীর প্রতীক ছিল তিনটি গাছ একাশিয়া বা আকাশমণি গাছ। পেট্রা ছিল তার প্রধান উপাসনালয়। মক্কা অঞ্চলেও তার উপাসনা হলেও মন্দির ছিল মক্কার পূর্বে তাইফের নাখলা নামক স্থানে। কুরাইশরা নিজেদের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের আশায় তার পূজা করতো। উজ্জাকে আরবে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে গণনা করা হতো, এছাড়া তার নামে শপথবাক্য পাঠ করা হতো। উজ্জা ছিল গাতফান গোত্রের আবাসভূমিতে অবস্থিত একটি বৃক্ষের নাম। সমস্ত গাতফানিরা ঐ বৃক্ষের পূজা করতো। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত, নাখলার একটি কুঠুরির নাম ছিল উজ্জা। কুঠুরিটি রক্ষণাবেক্ষণ করার ভার ছিল বনি শায়বান গোত্রের লোকেদের উপর। আর বনি শায়বান ছিল কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধিবদ্ধ। কুরাইশ ও বনি কেনানাদের এটাই ছিল সর্ববৃহৎ মূর্তি।
 মানাত
 মানাতকে ভাগ্যের  দেবী বলে ভাবা হতো।তার মন্দির স্থাপিত হয়েছিল মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী রাস্তার উপরে কুবেদ নামক স্থানে। এই মন্দিরে একটি কৃষ্ণপ্রস্তর রক্ষিত ছিল। মদিনায় আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকজন এই দেবীকে বেশি সম্মান দেখাতো। মক্কার প্রধান তিন দেবীর মধ্যে মানাত ছিল সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্য, সময় ও মৃত্যুর দেবী। প্রধান তিন দেবীর মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে প্রাচীন। তাকে গ্রিক দেবী আনাঙ্কের সাথে তুলনা করা হয়। মানাতের আরবি অর্থ অনুসারে একে ভাগ্যের দেবী বলা হয়।আরবের মানুষ তাদের উপাধি হিসেবেও মানাত ব্যবহার করতো। এই দেবীর প্রাচীন মূর্তি ছিল কাঠের উপর আঁকা। তবে উল্লেখযোগ্য মূর্তির অবস্থান ছিল আল মুসাল্লালে। তীর্থযাত্রীরা এখানে এসে নিজেদের মাথা মুণ্ডন করতো এবং তার মূর্তির সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো। তারা মনে করতো, এই দেবীকে দর্শন না করলে তাদের তীর্থযাত্রা থেকে যাবে অসম্পূর্ণ। অনেকেই দেবতা হুবালকে এই দেবীর স্বামী বলে মনে করেন।

ঐতিহাসিকরা মনে করেন অতীতে মক্কা ও অন্যান্য অঞ্চলের লোকজন মক্কায়  গিয়ে হোবাল ও এই তিন দেবীর পূজা করতো। এই দেবী- বিগ্রহগুলোর অস্তিত্ব থেকে বুঝতে পারা যায, আরবের সমাজ প্রাচীনকালে মাতৃপ্রধান ছিল। তথাপি, সবচেয়ে নারীর বঞ্চনার ইতিহাস কিন্তু আরবদেশেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। 
ইহুদী ধর্মে এবং খ্রীষ্টান ধর্মতে মূর্তিপূজা বা দেবদেবীর মূর্তি পূজার কথা শোনা যায় না। ইসলাম ধর্ম তারও অনেক পরে প্রবর্তিত,আর সেখানেও  মূর্তি পূজার কথা বলা নেই কোথাও। অনেকেই মনে করেন প্রাচীন আরব ধারার সঙ্গে ভারতীয় ধারার একটি দিক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মনে রাখতে হবে ভারতীয় হিন্দুসমাজের  মানুষেরা (তা  সে একেশ্বরবাদীই হন বা বহু ঈশ্বরবাদী হন না কেন,  ) কিন্তু বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি বন্দনার মধ্যে দিয়ে তাঁরা ভগবানের সান্নিধ্যের প্রার্থনা করেন (কিম্বা সান্নিধ্য অনুভব করেন)। 


সূত্র:History of Arabs, Philip K. Hitti, 6th edition











মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ