মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসরঃপুরাণ ও মহাকাব্য চর্চা -পর্ব -৬ / প্রবীর দে

দশ রাজার যুদ্ধ: প্রথম সমাজ বিপ্লবের  ইতিহাস

প্রবীর দে

কটু গভীরে গিয়ে যদি পর্যবেক্ষন করা যায় তাহলে দেখা যায়  ...পুরাণ ও মহাকাব্যের মূল বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হল  প্রাচীন সমাজবিপ্লব ।শ্রেণি সংগ্ৰামের,সমাজ বিপ্লবের প্রথম ইতিহাস ছিল  পুরাণে বর্ণিত দশরাজার যুদ্ধ।

ঋকবেদে দশ রাজার যুদ্ধের কাহিনির  কথা জানা যায়।  উপনিষদেও আছে এই যুদ্ধের কথা। বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তিগুলির জোটবদ্ধ হওয়া এবং স্বৈরাচারীতার বিরুদ্ধে সংগ্ৰামের প্রথম ইতিহাস হল এই দশ রাজার যুদ্ধ। দশরাজার যুদ্ধে উপজাতি শ্রেণির রাজাদের জোট হয়ত জয়লাভ করতে পারেনি এটা ঠিক, তবে সেই লড়াই ছিল শ্রেণিসংগ্ৰামের প্রথম লড়াই। শ্রেণি সংগ্ৰামের প্রথম এই লড়াইয়ের সংগঠক, পথদ্রষ্টা ছিলেন ঋষি বিশ্বামিত্র। দলিত বিপ্লবের সর্বপ্রথম কারিগর যদি তাঁকে বলা হয়, অত্যুক্তি হবে না হয়ত।

ভরত বংশীয় রাজা দিবােদাসের পুত্র রাজা সুদাস ছিলেন ভরত গােষ্ঠীর রাজা। সুদাস - এর পুরােহিত ছিলেন বিশ্বামিত্র। বিশ্বামিত্রের কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে সুদাস বিশ্বামিত্রের পরিবর্তে বশিষ্ঠ্যকে প্রধান পুরােহিত পদে নিয়ােগ করেন। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্র দশটি আর্য উপজাতি দশ রাজার জোট গড়ে সুদাসকে আক্রমন করেন। বহু বাঁধা বিপত্তির পর সুদাস যুদ্ধে জয়লাভ করেন। এটি দশ রাজার যুদ্ধ নামে পরিচিত।

যুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ 

যুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ বলতে .... এক দিকে ছিলেন রাজা সুদাস (তৎস্রু ও ভরত গোষ্ঠী) ও ঋষি বশিষ্ঠ্য। অন্য দিকে ছিলেন ঋষি বিশ্বামিত্রের গঠনে নিম্নলিখিত গোষ্ঠী সমূহ।

১) আলিনা -দক্ষিণ পূর্ব আফগানিস্তানের নূরিস্তান প্রদেশের গোষ্ঠী ,২) অনু- কোন অঞ্চলের গোষ্ঠী সঠিক স্থান জানা যায়নি। তবে মহাভারতের সময়ে এই অনু গোষ্ঠীর এক চক্রবর্তী সম্রাট অঙ্গ এর কথা উল্লেখিত আছে  ৩) ভৃগু -  স্থান গুজরাট ও নর্মদা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল সমূহ ৪) দাসা/দাহাই ৫) দ্রুযুশ (গান্ধার) ৬) মৎস্য- স্থান বর্তমান রাজস্থান। ৭) পারসু (পারস্য)- ৮) পুরু- স্থান বর্তমান সিন্ধু প্রদেশ, পাকিস্তান, আংশিক আফগানিস্তান। ৯) বালানা - বর্তমানে কাবুল। মনে করা হয় বোলানা গিরিপথের নামকরণ এই গোষ্ঠীর নাম থেকেই এসেছে।১০) পানি/পারনি/পান্নি - বর্তমান স্থান পাকিস্তান। মনে করা হয় পাখতুন জাতি এই পান্নি গোষ্ঠীরই উত্তর পুরুষ।

ঋগ্বেদ অনুযায়ী, এই সব কয়টি গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহেই লিপ্ত ছিল যতদিন  না পর্যন্ত ঋষি বিশ্বামিত্র এদেরকে একত্রিত করেন।  দশরাজার এই মহাযুদ্ধ দুটি পর্যায়ে হয়েছিল।  অসম যুদ্ধ এইটি ছিল। প্রত্যাশা মত ভরত গোষ্ঠীর রাজা সুদাসই জয়ী হন। 

যুদ্ধের প্রথম পর্বটি কুরুক্ষেত্রের পশ্চিমে মানুসার কাছে রাভি নদীর তীরে (তখন পরুষনী) সংঘটিত হয়েছিল। দ্বিতীয় পর্বটি হয় তারপরে, যুদ্ধক্ষেত্র (সম্ভবত) যমুনা নদীর তীরে স্থানান্তরিত হয়, যেখানে স্থানীয় সর্দার ভিদ তিনটি অন্যান্য উপজাতির সাথে পরাজিত হয় - অজ, শৃগ্রা ও যক্ষ।

 এই যুদ্ধ শেষে সম্পূর্ণ অঞ্চল  যা জম্বুদ্বীপ বলে খ্যাত ছিল ,তার  নতুন নাম  ভারত রূপে  প্রকাশিত হয়।    (শকুন্তলা-দ্যূষমন্ত পুত্রের নামানুসারে ভরত থেকে ভারত গোষ্ঠী ও সেই থেকে ভারত খন্ড। মহাভারতের কুরু বংশ এই ভরত গোষ্ঠীরই অংশ)।

যুদ্ধের প্রকৃত কারন কি ছিল

যুদ্ধের কারন নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। স্ত্রোত্রের ব্যাখ্যা ও কারন বিভিন্ন গবেষক বিভিন্ন ভাবে দিয়েছেন।

১/মাইকেল উইটজলের যুক্তি অনুযায়ী বিতারিত পুরোহিত বিশ্বামিত্র'র প্রতিশোধ স্পৃহা ও ষড়যন্ত্রের ফলে এই যুদ্ধ।

২/রণবীর চক্রবর্তী তাঁর বইতে লিখেছেন যে সম্ভবত পাঞ্জাব অঞ্চলের নদীগুলির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে এই নিয়ে বিরোধের ফলেই এই যুদ্ধ।

ফলাফল বস্তুত অসম এই যুদ্ধে সুদাইস জয়লাভ করেন। তবে দশরাজার যুদ্ধ প্রথম সমাজ বিপ্লবকে সূচিত করে বলে ধারনা করা যেতেই পারে। কিন্তু প্রথম সমাজ বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার অন্যতম কারিগর রূপে বিশ্বামিত্র কে ভোলা যাবে না। 






মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ