মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসরঃ গল্প -অভিমান / সাঁজবাতি



অভিমান

 

একমনে রাইটিং প্যাডের  দিকে তাকিয়ে আছে সুশান্ত।

বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরে ওর মনে হলো এবার সব ঠিক আছে।কি ঠিক আছে জানে না।কোন একটা ব্যাপারে খুব উদ্ধিগ্ন হয়ে রয়েছে। কিন্তু কেন এ রকমটা হচ্ছে বুঝতে পারছেনা।

 কম্পাউন্ডার কে ডেকে সুশান্ত বেরিয়ে এলো চেম্বার থেকে। বলল শরীর টা ভালো লাগছে না। দুই একজন পেশেন্ট বাইরে বসে আছে। তাদের কাল আপোয়েন্টমেন্ট দিতে।এই বলে নার্সিংহোমের রেষ্টরুমের দিকে গেল।কিছুক্ষন বসে কম্পিউটার টেবিলের ড্রয়ারের দিকে চোখ গেল।

কিছু জরুরী চিঠি এসে পড়ে আছে ড্রয়ারে ।সেগুলোর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

কলকাতার সেরা ডাক্তারদের মধ্যে অন্যত্তম কার্ডিয়ালজিষ্ট ডঃ সুশান্ত  রায়।অল্প বয়সেই নাম করে ফেলেছে অনেক। দায়িত্ব শুধু চেম্বারে সীমাবদ্ধ নয়। তার বৃত্তের সীমানা ছাড়িয়ে গরীব দুঃখী মানুষের পাশেও দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি।সপ্তাহে একদিন দুঃস্থ মানুষের চিকিৎসা করেন তিনি বিনা পারিশ্রমিকে।

টাইয়ের ফাঁস টা সামান্য আলগা করলো। ভ্যাপসা গরমে একটা সিগারেট ধরালো, ডান দিকের ড্রয়ারটা টান দিয়ে খুলে, দেখলো তার মধ্যে একটা খাম পড়ে রয়েছে  আন্দাজ করল সুশান্ত আজকের দিনটা একটু অন্যরকম আজ রিয়ার জন্মদিন।

 খামটা খুলে ছবিটা হাতে নিল। হাসিমুখে ওর দিকে তাকিয়ে রিয়া। ছবিটা ওর সাথে থাকে সব সময় ওকে ভুলে যাবার ভয় পায় সুশান্ত। কিছুতেই ভুলতে চায় না। এখন অবশ্য একটা মাএ এই ছবিটা ছাড়া রিয়াকে খোঁজার কোনো পথ নেই তার। সোস্যাল মিডিয়ায় ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল একবার অনেকদিন আগে।ব্লক করে রেখে দিয়েছে।কারনটা জানা নেই। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর একদিন ই মাত্র ফোন করেছিল সুশান্ত রিয়াকে  শুভ নববর্ষ জানাতে।

রিয়া বাড়িতে ছিল না ।ফোন ধরেছিল ওর মা। পরে সুশান্ত র ফোনের খবর শুনে, রিয়া বলেছিল, "এটুকুতেই যেন সীমাবদ্ধ থাকে "দ্বিতীয়বার  নম্বর ডায়াল করার সাহস পায়নি সুশান্ত।

 সেদিন বিকেলে ঝড় উঠলো তারপর সন্ধ্যার সাথে নামলো বৃষ্টিও।

কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় জল জমে যাচ্ছে। ফ্ল্যাটে ফিরে সুশান্ত জামা কাপড় বদলে ব্যালকনিতে বসলো। জলের ছাঁট লাগলো চোখে মুখে। সিগারেট খেতে ও ভালো লাগছেনা। কোথায় যেন একটা কুকুর ডেকে উঠল।

সুশান্ত মনের অলিগলিতে খোঁজে এখন সেই দিনগুলো। 

জলপাইগুড়িতে সুশান্ত তখন ক্লাস নাইন।

রিয়ার সাথে আলাপ হল ক্রমে বন্ধুত্ব। কিছুদিন মেলামেশার পর__

একসময় সুশান্ত বুঝতে পারল রিয়া ওর উপরে নির্ভর করতে শুরু করেছে।

ওর কথাবার্তা, ভাব প্রকাশ সুশান্তের বুকের আড়ালে যেন একটা শিহরন ভাব জাগিয়ে তুলেছে। ও বুঝলো যে ক্রমশ রিয়া ওর দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। সুশান্ত রিয়া একসাথে প্রাইভেট পড়তে যায় মনিষ বাবুর বাড়িতে।

রাত আটটা থেকে সাড়ে আটটার সময় যখন চার নম্বর গুমটি শুনশান প্রায়, সাইকেলে হাত ধরে রিয়ার পাশাপাশি হাঁটত সুশান্ত। বাড়ি পৌঁছে দেবার জন্য। তবুও মনের ভাব প্রকাশ করতে পারেনি কোনদিন ও। আরো কত দেরি হবে জানা নেই । অনেক বার ভেবেছে সবটা জানিয়ে দেবে। কিন্তু কি যেন একটা অজানা ভয় বারবার তাকে ঘিরে ঘিরে ধরেছে।

একটা ঘটনায় ওদেরকে হঠাৎ করে অনেক কাছাকাছি এনে দিল।

কোচিং এ পাশাপাশি বসে ওরা বেঞ্চিতে ।বাইরের আবহাওয়া সেদিন তেমন ভালো নয় ।কিছুক্ষণ পড়ানোর পর__ লোডশেডিং। মনিষ বাবু বললো মোমবাতি  জ্বেলে নিয়ে আসি বলে উঠে গেলেন।

আচমকা বাড়ির সামনে রাস্তার কয়েকটি কুকুর বিশ্রীভাবে চিৎকার করে ওঠে।

রিয়া সুশান্ত র হাতটা শক্ত করে ধরল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে রিয়াকে নিজের মনের কথা জানিয়েছিল।রিয়া প্রথমে অপ্রস্তুত হলেও সম্মতি আছে সে বুঝেছিল। খুব খুশি হয়েছিল সেদিন।রহিত সুশান্ত এর খুব কাছের বন্ধু,ওকে সবটা জানিয়েছি

 বৃষ্টিটা বাড়ছে ___টিনেজ থেকে সুশান্ত ফিরে এল তেত্রিশে। জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা মাঝে ঝরে গেছে অনেকগুলো বছর। দমকা হাওয়া এসে ছিল একটা।

 যখন উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্র বাড়িতে হঠাৎ করে জানাজানি এবং স্বাভাবিক প্রতিরোধের দেওয়াল খাড়া হয়ে গেছিল দু দিক থেকে।

 মাঝখানে উদয় হয়েছিল আর একজন যাকে তার আগে পর্যন্ত সুশান্ত বন্ধু বলেই জানত সেই রহিত।

 পর্দার আড়ালে যে সুশান্তের বিপক্ষে কথা বলে ওদের সম্পর্কটা ভাঙতে চেয়েছিল ।

 তার স্বরূপ টা জানতে অনেক দেরি করে ফেলেছিলো সুশান্ত।

আঘাতটা কোন দিক থেকে আসছে বুঝতে পারেনি তখনও।

সব শেষ ___চিঠি ,ছবি ফেরত দেওয়া নেওয়ার পালা, চলছে তখন। সে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছিল।  সারারাত ঘুম হয়নি অথচ তখন পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে।হয়ত রিয়া আর সুশান্তের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি চরম পর্যায়ে চলে গেছিল।যা ঠিক হবার ছিল না।

তারপর উচ্চমাধ্যমিক তারপর এল জয়েন্ট  সুশান্ত ভর্তি হল মেডিক্যাল কলেজে। রিয়া চলে গেল ইংরেজি অনার্সে। তখন একই ছিল পথঘাট কখনো কখনো দেখা হতো ,কিন্তু কথা হতো না। মেনে নিতে বাধ্য হলো সুশান্ত। কারণ রিয়ার রাগ অভিমানের উৎস এখনো খুঁজে পাইনি সে।

পরে শুনেছিল কোন একটা স্কুলে পড়ায় রিয়া বর্তমানে।

 আজ রিয়ার জন্মদিন এ কলকাতা থেকে অনেক দূরে জলপাইগুড়িতে বসে এখন কি করছে রিয়া ?ঘরে ফিরে এলো সুশান্ত।  হঠাৎ ঘুম পাচ্ছে খুব ।কী মনে হলো দরজায় লাগানো লেটার বক্স টা খুলল সুশান্ত। মাএর চিঠি এসেছে জলপাইগুড়ি থেকে।

 চিঠিটা খুলবার আগে সুশান্ত র মনে হল কেন অপেক্ষা করছে তার জন্য ?এখন সে প্রতিষ্ঠিত বড় ডাক্তার। ফ্ল্যাট বাড়ির আশেপাশে মেয়েদের সংখ্যা নেহাত কম নয় ।গত কয়েকটা চিঠিতে লিখেছেন বিয়ের ব্যাপারে মা-বাবা দুজনেরই ইচ্ছা । একমাত্র ছেলেকে ঘিরে ওদের স্বপ্ন অনেক। ছেলে কে সংসারী দেখার স্বপ্ন সব মা বাবার ই থাকে।

 চিঠিটা খুলল সুশান্ত। মা লিখেছে যেমন প্রতি চিঠিতেই লেখা  থাকে।বাড়ি আসার কথা ।শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়ার কথা। অনেকদিন বাড়ি যাইনি সুশান্ত। কাজের চাপ তো আছেই ,সাথে জলপাইগুড়িতে যাবার ব্যাপারে তীব্র  যন্ত্রনা যা ভোলা যায় না।

জীবনটাকে ঊনিশ বছর বয়স থেকে হিসেব করতে চায় । কিছু প্রশ্নের উত্তর সে কিছুতেই খুুঁজেপায় না। উত্তরগুলো খোঁজার চেষ্টা করেছে বহুবার কিন্তু পায়নি সে।

রিয়ার জন্মদিনে ঠিকমতো চেম্বার করতে ইচ্ছে করেনা। কোন পার্টিতে যেতে ইচ্ছা করে না। রিয়ার ছবি  খুলে দেখতে ইচ্ছা করে বারবার।

যাইহোক চিঠিটার শেষে যা লেখা সুশান্তের চোখ স্থির হয়ে যায় প্রায়। মায়ের  লেখা আগামী ৬ইমে রিয়ার বিয়ে।

কিছুক্ষণ একইস্থানে দাঁড়িয়ে থাকে সে।চিঠিটা টেবিলে রেখে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করলো ধরালো তারপর আবার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো ,এবং জীবনের প্রথম এতবড় ধাক্বার সন্মুখীন হল সে ।কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।

বৃষ্টি থেমে গেছে। চাঁদের আলো ফুটে উঠেছে।কি সুন্দর  চাঁদের আলো ।  চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর মনে করতে থাকে রিয়ার মুখটাকে।  রিয়াকে কতগুলো বছর একবারও দেখিনি  সে।তবুও চাঁদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে বোধহয় মুখটাকে সেদিন। তাকিয়ে মনে মনে বললতুমি দূরে সরে যেতে পারো, কিন্তু আমি তো একবারই ভালোবেসেছি। ফেরো, না ফেরো,অন্যের হও তাতে কিছু যায় আসে না আমার,আমি তো থাকবো তোমার অপেক্ষায়। তোমার স্মৃতি আঁকড়ে কেটে যাবে বাকি জীবনটা ।কতই বা বড় জীবনটা"। অপেক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সুশান্ত।

ব্যালকুনি থেকে নীচে তাঁকালো  রাস্তার দিকে__ একটু আগে বৃষ্টি থেমে গেছে ,লোকজন চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল এখন আবার চলাচল করছে___ এখন কলকাতা তার নিজের ছন্দে আর জীবন তার নিজের গতিতে ফিরেছে।

একটা টানে সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সুশান্ত।  এসে রাইটিং প্যাডটা টেনে নিল।

দীর্ঘ  তেরো বছর বাদে সুশান্ত আবার রিয়াকে চিঠি লিখছে।










মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ