মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসরঃ গল্প-মোহ / সুপ্তা আঢ্য



মোহ / সুপ্তা আঢ্য


সকালের বাজার সেরে ভাড়া বাড়ির বারান্দায় ধূমায়িত চায়ের কাপ আর খবরের কাগজটা হাতে নিয়ে অফিস যাওয়ার আগে রোজই এইসময়টায় এসে বসে সুতনু। এসময় হাজার ডেকেও কেউ ওর সাড়া পাবেই না। পুরো কাগজ আর দ্বিতীয় রাউন্ডের চায়ের শেষে অফিস যাওয়ার জন্য চেয়ার ছাড়ে ও। আজও তার ব্যতিক্রম হোতো না যদি না কাগজের বিজ্ঞাপনের জায়গায় এসে চোখটা আটকে যেত। খবরটা দেখে সব ভুলে রান্নাঘর থেকে স্ত্রী দীপাবলীকে ডেকে বলল"দীপা, খবরটা একবার দেখো।"

"ও তুমি দাগ দিয়ে রেখে দাও। আমি দুপুরে পড়ে নেব। এখন আমার সময় নেই গো।"

স্ত্রীর হাত ধরে টেনে পাশের চেয়ারে বসিয়ে বলল"খুব সময় হবে। বসো তো - - - খবরটা শুনলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে।"

"বেশ তো----তুমিই পড়ে শোনাও।"

"কলকাতা ছাড়িয়ে শহরতলি মাধবপুর ঢুকতেই ছয়কাঠা জমির ওপর বাড়ি বিক্রি। ইচ্ছুক ব্যক্তি সত্ত্বর যোগাযোগ করুন। "খবরটা পড়ে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে সুতনু বলল"কী বুঝলে দীপা?"

" বুঝলাম - - - তুমি শহর ছেড়ে শহরতলিতে বাস করতে যাবে। মতিভ্রম কাকে বলে! "

"না দীপা, মতিভ্রম নয়। শহরের দূষণের থেকে শহরতলিই ভালো। ফাঁকা ফাঁকা - - - শান্তির আবাস।" স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে সুতনু বলল"আরে বাবা, দেখে তো আসি। পছন্দ হলে তবে না কিনব! আর দেখো, শহরের ভাড়াবাড়ির থেকে শহরতলির নিজের বাড়ি অনেক আরামের। "

" তা বটে। তাই করো।"

মনের মধ্যে অদেখা অজানা ভবিষ্যতের নিজের বাড়ির স্বপ্ন দেখতে দেখতে কাগজে উল্লিখিত নম্বরে ফোনটা করে অফিসের শেষে বিকেলে সময়টা নিল সুতনু।এক আনন্দের সওয়ারে সওয়ারী হয়ে কোনোরকমে খেয়ে দেয়ে অফিস চলে গেল ও। আর হাতের সব কাজ সমাধা করে স্নান সেরে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনটা বারবার দেখতে দেখতে দীপা ওরফে দীপাবলীর মনেও একটা ক্ষীণ আশা উঁকি দিচ্ছিল। বিয়ের পর থেকে এতগুলো বছর ভাড়া বাড়িতেই কেটে গেল ওদের।ছেলে ঋষভও দেখতে দেখতে বড়ো হচ্ছে। আর শহরে মোটামুটি বাজেটে মনের মতো বাড়ি পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার। বাড়ি পছন্দ হলেও আকাশ ছোঁয়া দামে হাত পুড়ছে ওদের আর বাজেটের মধ্যের বাড়িগুলোয় চোখ দিতেই ইচ্ছে করছে না। তার থেকে এই ভালো। সুতনুর অফিস আর ঋষভের স্কুল এমন কিছু দূর হবে না। এই ভেবে খবরের কাগজটা দেখতে দেখতে হঠাৎই চোখটা একটু লেগে এসেছিল ওর। হঠাৎ ফোনের আওয়াজে সচকিত হয়ে রিসিভার তুলতেই সুতনু বলল"আমি অফিস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি, ফিরতে দেরী হতে পারে।"

"এসময় অফিস থেকে তুমি কোথায় যাচ্ছ?"

"আরে, ওই ভদ্রলোক ফোন করেছিলেন। এখুনি দেখা করে আজই বাড়ি দেখাবেন।"

ভ্রূ কুঁচকে দীপা বলল"এত তাড়া কিসের ওনার। দেখো আবার যেন কোনো গণ্ডগোল না হয়।"

"সেসব কিছু নয়----উনি বিদেশে থাকেন। পৈতৃক বাড়ি আর রাখবেন না। ওনার ফেরার তাড়া আছে-----তাই তাড়াতাড়ি করতে চাইছেন। আমি আসছি বুঝলে। ঋষভকে সময়ে পড়তে বসিও আর চিন্তা কোরো না। "

চিন্তা করতে বারণ করল বলেই বোধহয় দীপার কপালের রেখায় চিন্তারা ভিড় করে এল।কোথায় কার সাথে গেল----ভাবতে ভাবতে হাজারো চিন্তা মনের মধ্যে ভিড় করে আসছিল ওর। বিয়ের পর থেকেই বাসাবাড়ি বদল করে আসছে ওরা। ছোট্ট ঋষভকে সাথে নিয়ে বাড়িবদল, নতুন বাড়িকে সাজিয়ে নিজের মনের মতো করে তুলতে তুলতেই বাসা বদলের সময় এসে যেত। বাড়িবদল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে ওরা। বাড়িবদলের পর ছোট্ট ঋষভেরও নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে বেশ কষ্টই হতো। আর সেসময় সুতনুরও অবস্থা ছিলনা বাড়ি কেনার। গতবছর প্রমোশন পাওয়ার পর থেকেই ও উঠেপড়ে লেগেছে নিজেদের একটা বাড়ির জন্যে। আর ঋষভও বড়ো হয়েছে - - - - ওও চায় অন্যান্য বন্ধুদের মতো নিজেদের বাড়িতে থাকতে।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে অনেকটা বেলা বয়ে গেছে খেয়ালই হয়নি ওর। খেয়াল হলো দরজায় কলিং বেলের আওয়াজে ।চমক ভেঙে ঘড়ির দিকে তাকাতেই বুঝল ঋষভের আসার সময় হয়ে গেছে। দরজা খুলে ছেলেটাকে ঘরে ঢুকিয়ে নিল ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুপুরের খাওয়া সেরে ছেলেকে নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তে ঋষভ ঘুমিয়ে পড়লেও দুশ্চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারল না দীপা। কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করে উঠে সুতনুকে ফোন করলে ফোনটা নট্ রিচেবল পাওয়ায় ওর কপালের ভাঁজ আরো গভীর হয়ে গেল।ফোনটা হাতে নিয়েই ছেলের পাশে এসে শুয়ে পড়ল ও। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি দীপা। হঠাৎ ঘড়ির দিকে চোখ পড়তে আলস্য ভেঙে ছেলেকে উঠিয়ে নিজেও বিছানা ছেড়ে অন্যমনস্ক ভাবেই বিকেলের সব কাজ সেরে সন্ধে হতেই ছেলেকে পড়াতে বসলেও মনটা আজ আনমনাই ছিল ওর। বাইরের দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল বারবার, সুতনুর জন্য দুশ্চিন্তাটা বুকের মধ্যে চেপে বসেছিল ওর।

ওদিকে সুতনু অফিস থেকে বেরিয়ে পার্ক স্ট্রিটের একটা ক্যাফেতে ভদ্রলোকের সাথে দেখা করল। প্রথম দেখাতেই মোহাবিষ্ট হয়ে গেল ও।ভদ্রলোকের নাম স্বর্ণকমল মজুমদার-----প্রায় ছ ফুটের কাছাকাছি লম্বা----ফর্সা দোহারা চেহারা। চেহারা না হলেও কপালের দুপাশের রূপোলী চুল গুলো বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওনার বয়সের কথা। দুটো কফির অর্ডার দিয়ে স্বর্ণকমল বাবুই কথা শুরু করলেন প্রথম "দেখুন কাজের কথাতেই আসা যাক।"

" হ্যাঁ আপনি ঠিকই বলেছেন। "

" দেখুন, মাধবপুর ঢোকার বড় রাস্তাতেই ছকাঠা জমির ওপর ভিত্তি করেই পৈতৃক বাড়ি।একসময়ের বড় পরিবার ছোট হতে হতে এখন আমি একা----- বর্তমানে প্রবাসী-----কানাডায় থাকি।বাবা মা মাত্র ছদিনের ব্যবধানে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে ওপরে চলে গেছেন। আমারও ওদেশে ফিরে যাওয়ার সময় এসে গেছে। এখানে আসার শিকড়ের টান তো আর রইল না-----তাই এখানকার পাট একেবারে চুকিয়ে চলে যেতে চাই। সেজন্যই এই সিদ্ধান্ত। "

" আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি। বাসা বদল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। এবার একটা জায়গায় একটু থিতু হতে চাই। তাই আপনার দেওয়া বিজ্ঞাপনটা দেখে আর দেরী করিনি। "

" তাহলে তো ভালোই হল। আপনার সময় থাকলে চলুন একবার বাড়িটা দেখে আসবেন।"

"যেতে তো ইচ্ছে করছে। কিন্তু ফিরতে ফিরতে অনেকটা দেরী হয়ে যাবে। তাই - - - - "

" আপনি চিন্তা করবেন না। আপনার ফেরার ব্যবস্থা আমি করে দেব, চলুন।"

এরপর স্বর্ণকমল বাবুর কথার দ্বিরুক্তি না করে ওনার সাথেই মাধবপুরের দিকে রওনা দিল ও। কলকাতা থেকে মাধবপুর আসতে খুব বেশী সময় লাগল না গাড়িতে।গাড়িতে আসতে আসতে দুপাশের পরিবেশ, ফাঁকা মাঠ বেশ চোখ টানছিল সুতনুর। মনে মনে বাড়ির স্বপ্নটা আরও জাঁকিয়ে বসল ওর। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাধবপুর পৌঁছে বড় বাড়িটার সামনে দাঁড়াতে গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটা দেখে একেবারে হকচকিয়ে গেল সুতনু। প্রায় ছকাঠা জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা বড় মায়াবী। পুরোনো ধারার বাড়িটা একটা অন্য রকমের ঐতিহ্য বহন করছে। স্বর্ণকমল বাবুর সাথে বাড়ির চারপাশটা ঘুরে অনেকটা জায়গা জুড়ে বানানো কেয়ারি করা ফুলের বাগান পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকার সময় বাগানের গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে চোখ আটকে গেল সুতনুর। বেশ যত্ন নিয়ে তৈরি বাগানটা। বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছগুলো সাজানোয় কোনো অসামঞ্জস্য নেই। বাড়ির সামনের অংশে শুধুই ফুল আর রংবাহারী পাতার গাছ আর পিছনের অংশটা জুড়ে থাকা আম কাঁঠালের গাছগুলো ছায়ায় ঘিরে রেখেছে বাড়িটাকে।বাড়ির বাইরের পরিবেশটা দেখেই বাড়িটা কেনার ব্যাপারে মনের সায় আরও একধাপ বেড়ে গেল ওর। বড়ো বাড়িটায় ঢুকে বাড়িটা ঘুরে দেখতে দেখতে স্বর্ণকমল বাবুর কাছে ওই বাড়ির ইতিহাস মন দিয়ে শুনছিল সুতনু। স্বর্ণকমল বাবুর কথায় "এই বাড়িটার বয়স প্রায় দুশো বছর। আমার দাদামশাইয়ের দাদামশাই হৃদয়কমল মজুমদার ব্যবসার সূত্রে এখানে বাড়ি তৈরি করেন। তারপর থেকে পুরুষানুক্রমে আমরা এখানকারই বাসিন্দা। দাদামশাই ব্যবসার আরো উন্নতি করেছিলেন। কলকাতাতেও দাদামশাইয়ের বেশ কয়েকখানা বাড়ি আছে। আমার কাকা - জ্যাঠারা ওখানেই স্থায়ী হয়েছে। বাবা এই মাধবপুরকে ভালোবেসে কোথাও যেতে চাননি বলে আমরা এখানেই থিতু হয়েছি। এই বাড়ি আমার বাবার প্রাণ ছিল। প্রতিদিন নিজে সকালে উঠে এই বাড়ি, বাগানের তদারকি করতেন----কোথাও কোনোখানে একটু ময়লা পড়ে থাকলে ভীষণ রাগ করতেন উনি। আমি বাইরে থাকলেও এ বাড়ির সাথে যোগাযোগ ছেঁড়ে নি কখনও। তবে এখন শিকড়টা প্রায় ছিন্ন হয়ে এসেছে।তাই এই বাড়িটা আমি এমন একজনকে দিতে চাই----যে আমি মাঝে মাঝে এলেও তাঁরা না করবন না। আপনাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে-----আপনার কি পছন্দ হয়েছে বাড়িটা? "

" পছন্দ তো হয়েছে কিন্তু - - -? "

" কিন্তু কি সুতনু বাবু? "

" না---মানে----এই এতবড়ো বাড়ি কেনার ক্ষমতা কি আমার আছে? "

" না না----আপনার যা রেট আমি সেই দামেই দিতে রাজি আছি। "

" আপনি এত লোকসান কেন করবেন? আপনি তো আরও ভালো দামে বাড়িটা বিক্রি করতে পারবেন। "

" তা হয়তো পারব। কিন্তু আপনার মতো মানুষ আমি আর পাব না। আপনাকে আমার ভারী পছন্দ হয়েছে। "

" কোনো কিন্তু নয়, সুতনু বাবু। আপনার রেটেই আমি আপনাকে বাড়িটা দেব। শুধু একটা কথা, বাড়িটার কোনো বদল ঘটাবেন না----এরকমই রাখবেন। "

        এত বড়ো বাড়িটা প্রায় জলের দরে মাত্র চল্লিশ লাখ টাকায় পেয়ে যাচ্ছে এটা ভেবে ওর মনটা খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। ঠিক হলো একসপ্তাহের মধ্যে টাকাপয়সা জোগাড় করে বাড়িটা কিনে নেবে ও। আর তারপরেই দেশ ছাড়বেন স্বর্ণকমল বাবু।

  কথায় কথায় রাত হয়ে যাওয়ায় নিজের গাড়িতে করেই ওর বাড়ি পৌঁছে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন স্বর্ণকমল বাবু। সব কাজ মিটিয়ে সুতনু যখন বাড়ি পৌঁছল তখন প্রায় রাত আটটা। অন্যান্য দিন সন্ধ্যে সাড়ে ছটার মধ্যেই বাড়ি পৌঁছে যায় ও। সুতনু বাড়ি পৌঁছে দেখল দীপা আর ঋষভ উৎকণ্ঠিত মুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ওদের এভাবে দেখে গলায় হাসি টেনে বলল"কীরে, তুই পড়তে বসিস নি?"

"হ্যাঁ বসেছি তো! তুমি কখন আসবে----তাই বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।"

"আরে, আমি তো বলেই গেছি। এত চিন্তার কী আছে।"

"সে তুমি যাই বলো-----এত রাত হয়ে গেছে, ঘরের মানুষ ঘরে না ফিরলে চিন্তা হয় বৈকি।"

ঘরে ঢুকে অফিসের ব্যাগটা রাখতে রাখতে বলল" আরে বাবা, সব কথা ফাইনাল করে আসতে একটু দেরী তো হবেই!

সুতনুর হাতে জলের গ্লাসটা দিতে দিতে দীপা বলল"সব কথা মানে? তুমি কি ফাইনাল করে এলে নাকি!"

"হ্যাঁ দীপা, একেবারে ফাইনাল করেই এলাম। ওনার হাতে বেশী সময় নেই। ওনাকে তো ফিরতে হবে। আর তাছাড়া ছকাঠা জমির ওপর সাজানো গোছানো পেল্লায় বাড়ি - - - - মাত্র চল্লিশ লাখে। কেউ হাতছাড়া করে!শুধু একটাই শর্ত আছে ওনার।"

"শর্ত! কি শর্ত! "

" বাড়িটার কোনো বদল ঘটানো যাবে না। অবশ্য এত সুন্দর বাড়ির বদল ঘটানোর দরকারও নেই। "

" কিন্তু আমার মনটা বড়ো খুঁতখুঁত করছে জানো। "

" কেন? "

" না মানে----কোনো খোঁজখবর না নিয়ে তুমি একবারে কথা দিয়ে দিলে! "

" একবার বাড়িটা কেনা হোক-----দেখবে আমরা ঠকিনি। স্বর্ণকমল বাবু ভারী সজ্জন ব্যক্তি। শোনো দীপা কালই ব্যাঙ্কে গিয়ে টাকার জন্য অ্যাপ্লিকেশন টা করে দেব। বৃহস্পতিবারের মধ্যে টাকাটা জোগাড় করে ফেলতে হবে। শুক্রবার ওনার সাথে দেখা হবে। "

পরের একসপ্তাহ বাড়ির টাকা জোগাড়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল সুতনু আর নতুন বাড়ির স্বপ্নে রঙিন দীপাবলী নিজের মতো করে গোছগাছ শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে সময় পেরিয়ে শুক্রবারটা এসেই গেল। আজই সবকিছু দেনাপাওনা মিটিয়ে বাড়িটা ওর হয়ে যাবে - - - এটা ভেবেই মনটা খুশীতে উৎফুল্ল হয়ে উঠল।আজ সুতনু দীপা আর ঋষভকে নিয়েই মাধবপুর যাবে। এত বড়ো একটা ব্যাপারে দীপারও থাকাটা প্রয়োজন বলেই মনে করে সুতনু।

    আজ কোনোরকমে দুটো ভাতে ভাত রেঁধেছে দীপা। এক অজানা উত্তেজনায় বেশী কিছু রান্নার ইচ্ছেটাও ছিল না ওর। বেলা দশটার মধ্যে খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়ে রেডি হতেই গাড়িটাও চলে এল। যাবার জন্য একটা গাড়ি আগে থেকেই বলে রেখেছিল সুতনু। ওদের পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় এগারোটা বেজে গেল। গাড়ি মাধবপুরের বাড়িটার সামনে দাঁড়াতে ওরা তিনজনে গাড়ি থেকে নামতেই দেখল ওদের আপ্যায়নের জন্যে একজন দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি থেকে নেমে পেল্লায় বাড়িটা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল দীপা।এতবড়ো বাড়িটা ওদের হবে এটা ভেবেই আনন্দ হচ্ছিল ঋষভেরও। ওর বন্ধুদের সকলের নিজেদের বাড়ি থাকলেও ওদের কোনো বাড়ি না থাকায় ঋষভের মনে বেশ একটা কষ্ট ছিল। যদিও এই নিয়ে বাবা মাকে কখনও কিছু বলেনি ও।

বাড়িটা দেখে দীপারও বেশ একটা আলাদা আনন্দ হচ্ছিল। কোথায় ছোট বাসাবাড়িতে কষ্ট করে থাকা আর কোথায় এই প্রাসাদের মতো বাড়ি - - - - যেটা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেদের হয়ে যাবে। বেশ হাত পা ছড়িয়ে দিব্য আরামে থাকা যাবে। বাড়িটা কিনে মানুষটা ভুল কিছু করেনি। এসব ভেবে স্বামীর প্রতি ভালোবাসা কানায় কানায় ভরে উঠল ওর।

"বাড়ি পছন্দ হয়েছে তোমাদের?"

"আমার ভীষণ ভালো লেগেছে বাবা। কী বড়ো বাড়ি! এত বড়ো বাড়িটায় শুধু আমরা থাকব মা?"

"হ্যাঁ বাবু, এটা এখন থেকে আমাদের বাড়ি হয়ে যাবে। আর আমাদের বাসা বদল করতে হবে না। দীপা, তোমার পছন্দ হয়েছে?"

"হ্যাঁ গো, ভীষণ পছন্দ হয়েছে। বাড়িটা দেখে আমি তো চোখ ফেরাতেই পারছি না - - - - কী সুন্দর করে সাজানো! "

" বাড়ির বাইরেটার মতো ভেতরটাও বেশ সাজানো গোছানো। চল ভেতরে যাওয়া যাক। "সুতনুর সাথে বাড়ির ভেতরে ঢুকে আরো অবাক হয়ে গেল দীপা। কী অসাধারণ রুচিশীলতায় সাজানো বাড়ির অন্দরমহল।দীপা মনে মনে ভাবল"এই বাড়ির রূপ পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না। বরং আরও যত্নে এই বাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলব।"

" কী ভাবছ দীপা? "

" কিছু না, দেখছিলাম।"

" এসো, ওনার সাথে পরিচয় করিয়ে দি।"

স্বর্ণকমল বাবুর সাথে পরিচয়ের পর ওনার আন্তরিকতায় মন ভরে গেল দীপার।। স্বর্ণকমল বাবু রেজিস্ট্রার সাহেবকে বাড়িতেই এনেছিলেন। বাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সব কাজ শেষ হতে দুপুর গড়িয়ে গেল। ওরা বাড়ি থেকে খেয়ে এলেও স্বর্ণকমল বাবুর জোরাজুরিতে দুপুরের খাওয়াটা সারতে বাধ্য হল ওরা। খাওয়া দাওয়ার শেষে ওনাদের কথাবার্তার ফাঁকে ঋষভ সারা বাড়ি চক্কর কাটতে চলে গেল। সব মিলিয়ে এই বাড়িতে প্রায় চব্বিশটা ঘর আছে। প্রতিটা ঘর পায়ে পায়ে ঘুরে দেখছিল ঋষভ। প্রতিটা ঘরে টাঙানো দেওয়ালজোড়া অয়েল পেন্টিং গুলো বেশ চোখ টানে। বড় প্রাণবন্ত ছবিগুলো। সব ঘর ঘুরে বারান্দায় এসে দেখল দোতলার বারান্দা থেকে বড়ো রাস্তার অনেকখানি অব্দি দেখা যায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঋষভ মনে মনে বলল"বর্ষায় এখান থেকে ভালো বৃষ্টি দেখা যাবে।" ওদিকে নীচে তখন ওরা তিনজন নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত। ঠিক হলো সামনের রবিবার স্বর্ণকমল বাবু রওনা দেবেন আর সোমবারেই সুতনুরা বাড়িতে প্রবেশ করবে। কথাবার্তার মাঝে হঠাৎই স্বর্ণকমল বাবুর চোখে পড়ল দরজার বাইরে এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবাড়ির বহুদিনের কাজের লোক বিহারী। বিহারীকে দেখে স্বর্ণকমল বাবু বললেন"কিছু বলবে বিহারী?"

"আমি কী আজই চলে যাব বাবু ?"

বিহারীর কথার উত্তর না দিয়ে সুতনুর দিকে তাকিয়ে স্বর্ণকমল বাবু বললেন"বিহারী যদি এ বাড়িতে থাকে, আপনাদের কী অসুবিধা হবে? ও এই বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে আছে। এটা আমার রিকোয়েস্ট বলতে পারেন!"

একবার দীপার মুখের দিকে তাকিয়ে সুতনু বলল" না না, আমার কোনো অসুবিধে নেই বরং ভালোই হবে। এত বড়ো বাড়ি, বাগান - - - একার পক্ষে দেখাশোনা করা দীপার পক্ষে সম্ভব নয়। উনি থাকলে ওর সুবিধাই হবে। "

" তাহলে তো ভালোই হল। বিহারী, তোমাকে এই বয়সে আর কোথাও যেতে হবে না। তুমি এখানেই থাকবে। আর এই বাড়ি, বাগান এইরকমই রাখবে-----কোন পরিবর্তন কোরো না। আমি হয়ত বাড়ির টানে এক আধবার আসতেও পারি। আপনাদের অসুবিধা হবে না তো, সুতনু বাবু? "

" কী যে বলেন। এ বাড়ি আপনারই-----যখন ইচ্ছে আসবেন। আজ তাহলে আমরা আসি। "

" আপনারা সোমবার চলে আসুন। আমি তো পরশু ভোরেই বেড়িয়ে যাচ্ছি। বিহারীকে বলে যান, ও সব ব্যবস্থা করে রাখবে। "

আরো বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর সুতনুরা কলকাতার পথে রওনা দিল বুক ভরা আনন্দ আর চোখ ভরা স্বপ্নকে সাথী করে। বাড়ি ফিরতেই দীপা বাচ্চা মেয়ের মতো আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলল" আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে জানো! অত বড় বাড়িটা শুধু আমাদের---এটা ভাবতেই পারছি না। আবার উপরি পাওনা বিহারীকে পাওয়া গেল। তা নাহলে অতবড় বাড়িকে একা মেনটেন করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। আর তুমি ঠিকই বলেছিলে - - - - স্বর্ণকমল বাবু মানুষটি ভারি ভদ্রলোক। অত বড়োলোক কিন্তু কোনো অহংকার নেই। "

" ঠিকই বলেছ দীপা। তুমি গোছগাছ শুরু করে দাও। আমি বরং বাড়িওয়ালাকে বলে ভাড়াটা মিটিয়ে দিয়ে আসি। ঋষভ, মাকে একটু সাহায্য করো। আমি আসছি। "

বাড়ির সব গোছাতে গিয়ে দুটো দিন বড্ড কম মনে হচ্ছিল দীপার। আগেও বাসাবদলের সময় গোছগাছ করেছে, কিন্তু আজকের গোছানোটা সম্পূর্ণ অন্য রকমের। নিজের বাড়িতে যাওয়ার জন্য গোছানোয় এত আনন্দ জানত না দীপা। গোছগাছ করতে গিয়ে দুটো দিন যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বুঝতেই পারল না ওরা। মাঝে অবশ্য একদিন যাওয়ার আগে স্বর্ণকমল বাবু ফোন করেছিলেন।

সোমবার সকাল সাতটা নাগাদ বাড়ির সামনে গাড়ি গুলো দাঁড়াতে জিনিসপত্র ওদের সাথে হাতে হাত লাগিয়ে তুলতে লাগল সুতনু। সব জিনিস গাড়িতে ওঠাতে প্রায় নটা বেজেই গেল। প্রায় সওয়া নটা নাগাদ ওরা গাড়িতে উঠলে গাড়ি স্টার্ট দিতেই একবার পিছনে ফিরে বাসা বাড়িটা দেখে নিল দীপাবলী।এতবার বাড়ি বদল করেছে যে এখন বাড়ি বদলের সময় পুরোনো বাড়ির জন্যে এতটুকুও কষ্ট হয় না ওর। আর আজ তো নিজের বাড়িতে যাচ্ছে - - - - দুঃখের কোনো কারণই নেই।

প্রায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মাধবপুরে নিজেদের বাড়িতে পৌঁছে হর্ন দিতেই বিহারী হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসে জিনিসপত্র নামাতে লাগল। সব জিনিস বাড়িতে ঢুকে যেতেই বিহারীকে অনুসরণ করে বাড়িতে ঢোকার মুখে হঠাৎই এক জায়গায় চোখ আটকে গেল দীপাবলির। এত সুন্দর সাজানো বাড়ির ছাদের আলসেতে একটা সাদা আর একটা বেগুনী নয়নতারা হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে। একটু অবাক হলেও মুখে কিছু না বলে বাড়িতে ঢুকে গোছানোর কাজে লেগে পড়ল ও। ঋষভ বাড়িতে ঢুকেই বলটা নিয়ে পেছনের বাগানে খেলতে চলে গেল। আজকের দিনটা ছুটি নেওয়ায় সুতনুও স্ত্রীর সাথে বাঁধা জিনিসপত্র খোলার কাজে লেগে গেল। এর মধ্যেই বিহারী ওদের দুজনকে দুকাপ চা আর ঋষভকে একগ্লাস দুধ খাইয়েছে। বিহারী বলল,"তুমি গোছগাছ করে বিশ্রাম নাও বৌদিমণি। এবেলার রান্নাটা আমিই সেরে নিচ্ছি।"

সমস্ত গোছানো শেষ হতে প্রায় একসপ্তাহ লেগে গেল দীপার। অবশ্য সবটাই ও বিহারীকে সঙ্গে নিয়েই করেছে। এর মধ্যেই বিহারীর সাথে ওদের বেশ ভাব হয়ে গেছে। কাজ করতে করতে বিহারীর কাছে এবাড়ির গল্প শুনতে শুনতে এবাড়ির মানুষগুলোর সাথে একাত্মা হয়ে যাচ্ছে দীপা। একদিন ওপরের স্বর্ণকমল বাবুর বাবা যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরটা গোছাতে গোছাতে বলল"জানো বৌদি, কত্তাবাবার খুব ইচ্ছে ছিল, দাদা বাবুর বে দিয়ে টুকটুকে বউ ঘরে আনার। কিন্তু দাদাবাবু তো সারাজীবনে বে' ই করল না।এ নিয়ে কত্তামার দুঃখ ছিল খুব। দাদাবাবু একটা বে করে ছেলেমেয়ে হলে তো শিকড়ের টান থাকত আর একেবারে সব ঘুচিয়ে দেশান্তরীও হতো না।"

"আমরা আসায় তুমি খুশি হওনি? "

" খুব খুশি হয়েছি। আসলে ঋষভ বাবুকে দেখে কত্তামায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। কত্তামা তো এরকমই চেয়েছিল----ছেলে বৌ, নাতি নাতনী নিয়ে সংসার করবে। "

" তা তোমার দাদাবাবু বিয়ে করেন নি কেন বিহারী দা? "

" আসলে দাদাবাবু বরাবরই পড়াশোনা ভালোবাসে। তাই লেখাপড়ার ক্ষতি হবে বলে বে করেননি। "

কথা বলতে বলতে দীপার হঠাৎই বাইরের বাগানে চোখ আটকে গেল। দেখল, এই দুপুরবেলা এক বয়স্ক ভদ্রলোক ছাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎই গা টা ছমছম করে উঠলো ওর। এখন বাড়িতে কেউ নেই। ঋষভ স্কুলে, সুতনু অফিসে আর বিহারীদাও অন্য দিকে গেছে। নীচে নেমে ভদ্রলোককে ডাকতে গিয়ে দেখল কেউ নেই। এক অজানা আতঙ্ক ঘিরে ধরল ওকে।ঘরে ঢুকে এসে ভদ্রলোকের চেহারার বর্ণনা দিয়ে সবটা বলতেই বিহারী ভ্রূ কুঁচকে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। সুতনু অফিস থেকে ফিরলে ওকে ঘটনাটা বলতেই হেসে উড়িয়ে দিল ও।

এরপর থেকে প্রায়ই ওই ভদ্রলোককে দুপুরবেলায় ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে দীপা। মনে মনে ভয় পেলেও মুখে কাউকেই প্রকাশ করে না ও। এরপর হঠাৎই একদিন ছাদে উঠতেই আলসের গাছদুটোর কথা মনে পড়ে যেতেই মুখ বাড়িয়ে দেখল গাছদুটো সেরকমই আছে। বরং আরো ফুলে ফুলে ঝাঁকড়া হয়ে উঠেছে। দীপা ভেবে পেল না এত সুন্দর বাড়ির ছাদের আলসের দুটো গাছ কিভাবে আছে? " কাল বিহারীদাকে বলে আলসের গাছদুটো উপড়ে ফেলে দিতে হবে।" কথাটা ভাবতে ভাবতে হঠাৎই নীচে তাকিয়ে ওই ভদ্রলোককে আবারও দেখতে পেল ও। হন্তদন্ত হয়ে নীচে নেমে আর কোথাও ওনাকে দেখতে না পেয়ে বিহারীদাকে বলতেই বিহারী দাও মাথা নেড়ে জানিয়ে দেয় দেখেনি বলে। এরপর কথায় কথায় ছাদের আলসের গাছ দুটোর কথা বলতেই বিহারী বলল" ওই গাছদুটো ছিল কত্তাবাবুর প্রাণ। বাড়ি রং হওয়ার সময়েও গাছদুটো তুলতে দেননি উনি। বলতেন:বুঝলি বিহারী আমি মরে গেলেও এই গাছদুটোর মায়া ছাড়তে পারব না।" কথাটা শুনেই সারা শরীর শিরশিরিয়ে উঠল দীপার।তাহলে কী - - - -? আর কিছুই ভাবতে পারল না ও। চোখের সামনে ভদ্রলোকের আবছা অবয়ব ভেসে উঠতেই জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ও। বেশ কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরতে সামনে বিহারীকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করল" তাহলে কী ওই ভদ্রলোক তোমার কত্তাবাবু? লুকিয়ো না বিহারীদা, আমাকে সত্যি কথা বলো।"

"হ্যাঁ বৌদিমণি - - - - উনিই কত্তাবাবু ।ওই গাছদুটোর টানেই আসছেন।"

"কি করলে উনি মুক্তি পাবেন বিহারীদা?"

"সেটা তো আমি জানিনা বৌদিমণি।"

"তোমার দাদা বাবু জানতেন?"

"না, আর তাছাড়া দাদা বাবু তো এসব মানেই না। আমি দেখছি বউদিমণি কী করা যায়। তুমি চিন্তা কোরো না। কত্তাবাবু কোনো ক্ষতি করবে না। "

বিহারী বললেও মন থেকে ভয় গেল না দীপার। ভয়ে দুশ্চিন্তায় ও কাঠ হয়ে রইল। সুতনু অফিস ফেরত সব কিছু শুনে হেসে উড়িয়ে দিতে পারল না আগের মতো। কানাডায় স্বর্ণকমল বাবুকে ফোন করে আসতে অনুরোধ করলো।

এরপর থেকে ভয়ে আর দুপুর বেলায় বাইরের দিকে তাকায় না দীপাবলী। কয়েকদিনের মধ্যে স্বর্ণকমল বাবু এবাড়িতে এসে সবকিছু শুনে বাবা মায়ের পিণ্ড দিতে আগ্রহী হলে সুতনুও সায় দেয় ওনার কথায়। পরেরদিন বিকেলে রোজকার মতোই ছাদে গিয়েছিল দীপাবলী।ছাদে ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সন্ধ্যে নেমে এসেছে খেয়াল ছিল না ওর। হঠাৎ শাঁখের আওয়াজে সম্বিত ফিরে পেয়ে পিছনে তাকাতেই দেখল অন্ধকারের মধ্যে ছাদের আলসের ধারে ধোপদুরস্ত ধুতি পাঞ্জাবি পরা সেই ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন।কাছেই কোথাও একটা পেঁচা একটানা ডেকে চলেছে। মোহগ্রস্তের মতো সেদিকে এগিয়ে গেল ও।ওকে দেখে ভদ্রলোক ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন "কাল খোকা আমার মুক্তির ব্যবস্থা করেছে। খুব ভালো হবে। শুধু ও যখন নদীতে যাবে, ওকে বোলো এই গাছদুটো যেন সবকিছুর সাথে জলে ভাসিয়ে দেয়। এই ছোট্ট গাছদুটোই আমার প্রাণ। এই বাড়িতে তোমরা ভালো থেকো।" কথাগুলো বলে ছাদের কোণায় যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন ভদ্রলোক।চারিদিকে তাকিয়ে কোথাও ওনাকে দেখতে পেল না দীপা। নিজেকে ঠিক রেখে কোনোমতে নীচে নেমে সবাইকে সব কথা বলতেই অবাক হয়ে গেলেন স্বর্ণকমল বাবু।

পরদিন পূজার শেষে গঙ্গায় যাওয়ার আগে নিজেই ছাদে উঠে পরম যত্নে গাছদুটো তুলে এনে একটা ট্রে তে রেখে সবকিছুর সাথে জলে ভাসিয়ে দিয়ে এলেন উনি। সন্ধ্যে বেলায় বিষণ্ণ মনে সুতনু আর দীপাকে ডেকে বললেন"আমার শিকড়টা আজ সত্যিই ছিঁড়ল সুতনু বাবু। আর বাবা আসবেন না। আমিও কাল চলে যাচ্ছি। বাড়িটার কোনোরকম বদল ঘটাবেন না। তাতেই আমার বাবা মা ওপরে বসে শান্তি পাবেন।" কথাগুলো বলে ধীর পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন স্বর্ণকমল বাবু।

এরপর থেকে আর কোনোদিন ওই ভদ্রলোককে দেখেনি দীপা তবে মাসখানেক পর ছাদের আলসেতে আরও দুটো নয়নতারা গাছ দেখে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উঠল দীপাবলী।দেখল সন্ধ্যের আঁধারে ছোট্ট গাছদুটো হাওয়ায় তিরতির করে মাথা দোলাচ্ছে ।




মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ