মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসরঃআলোচনা-যুক্তি দিয়ে পুরাণ ও মহাকাব্য চর্চা, পর্ব-৪ "ছোট মুখে বড় কথা " "স্বর্গের ঠিকানা " / প্রবীর দে



ছোট মুখে বড় কথা 

"স্বর্গের ঠিকানা "

মানুষ গোড়া থেকেই তার দেবতাকে নিজের স্বরূপে কল্পনা করে নিয়েছিল।  মানুষের যে সব দোষ-গুণ আছে,  দেবতাদেরও সে দোষ গুণ থাকতেও পারে , মানুষের এধারনা ছিল বা আছে। দেবতার অস্তিত্ব মানুষের মননে একথা যদি বলি ,নিজেকে খুব যুক্তিবাদী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু একটা কথা,  বেদ ,পুরাণে উল্লিখিত ঘটনা সব কিন্তু মানুষের ই সৃজন । স্মৃতি আর শ্রুত 'র দ্বারা যখন তারা গ্ৰন্থিত হল , মানুষ তাকে শ্রদ্ধার সাথে সাহিত্য কর্ম রূপে  স্বীকৃতি দিলো।  সাহিত্য কি শুধুই কল্পনাপ্রসূত? মনে রাখতে হবে ,বাস্তব সমাজ ও পারিবারিক জীবনের চালচিত্রের  বর্ণনা,তাকে স্মৃতি ও শ্রুতিদ্বারা সাহিত্য ধর্মী উপস্থাপনের গাঁথাই  হল পুরাণ ও মহাকাব্যের মূল ভিত্তি।

তাই এটা মনে হওয়া কিছু দোষের নয় যে দেবতারাও  হয়ত এক শ্রেণীর  মানব জাতি । স্বর্গ ছিল তাঁদের বাসস্থান যা কিনা এই ভূমন্ডলের নির্দিষ্ট কোন স্থান , আমরা পুরাতত্ব অনুসারে ও নিজস্ব যুক্তিগ্ৰাহ্য মত দিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করতে পারি যে স্বর্গের অবস্থান বর্তমান পৃথিবীর কোন জায়গায়!

সনাতনী হিন্দু ধর্মগ্ৰন্থাদী পাঠ করে  অনুমান করা যেতেই পারে যে   দেবতারা যেখানে থাকতেন সেই  স্থান(স্বর্গ) থেকে  তাঁরা বহু আগে  ভারতবর্ষে (মর্তে)  এসেছিলেন।সুতরাং শাস্ত্র,পুরাণ , মহাকাব্যে উল্লিখিত তথ্য বিশ্লেষণের দ্বারা   তাঁদের  পূর্বে বর্ণিত ঠিকানা র বর্তমান অবস্থান অনুসন্ধান করা যেতেই পারে। আর এটাও  অনুমান করতে একটুও দ্বিধা হয় না যে  হিন্দু শাস্ত্রের পুরাণ,মহাকব্যে বর্ণিত স্বর্গের ঠিকানা  বর্তমান এশিয়ার  কোন অঞ্চল অবশ্যই।।

বিপরীত  অনুমান করতেও দোষ নেই .... দেবতাদের বসবাস আজ আর স্বর্গ বলে নির্দিষ্ট কোন স্থান নয়,সমগ্ৰ পৃথিবীতেই তাঁরা ছড়িয়ে আছেন(কারনটা  হয়ত ,ধরে নিতে পারি, তেত্রিশকোটি  সংখ্যা র দেবতারা নিশ্চয়ই সংখ্যাধিক্যের চাপ নিয়ন্ত্রণ না  করতে পেরে অর্থনৈতিক জীবন ধারনের জন্য  মর্তের (পৃথিবীর) বিভিন্ন  জায়গায় (গোটা  পৃথিবী জুড়েই ) মাইগ্ৰেট হতে বাধ্য হয়েছিলেন।।  আমার হিসেব অনুযায়ী দেবতারাও একপ্রকার মানব জাতি।সারা পৃথিবীতে দেবতারা মানুষের মধ্যেই মিশে আছে। মানতে কোন বাধা নেই,  কর্মফলেই মানুষ দেবতা হয়।  দেবতারা যেহেতু মানুষের মধ্যেই মিশে আছে আজ তাই স্বর্গের আর নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা নেই।

কিন্তু, আমরা মনের প্রশান্তি আনয়নের চেষ্টায় ,মৃত্যুর পরে মানুষের কাল্পনিক বসবাসের স্থানকে স্বর্গ বলে বিবেচনায় যেহেতূ এনে থাকি ,এবং তার স্থান কোথায় আছে  সে সম্বন্ধে উল্লেখ করতে না পেরে তারপর  মহাশূণ্যে র দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলি " 'ঐ....দিকে".।কোথায় আছে ধারনা কারও নেই ...তবু বলা! এখনকার (বর্তমান কালের) বিভিন্ন গ্ৰন্থে স্বর্গের  উল্লেখ রয়েছে  কিন্তু  মৃত্যুর পরে স্বর্গের নির্দিষ্ট কোন ভৌগলিক  স্থান সম্পর্কে কোন কিছুই বলছে না ।

যাক    এবার আসি পুরোনো সেই স্বর্গের ঠিকানা র খোঁজে। হিন্দু শাস্ত্রে বর্ণিত স্বর্গের অবস্থান সঠিক ভাবে ঠিক কোথায় এই নিয়ে সংশয়ের নিরসন  আজও ঘটে নি।   মহাভারতে বর্ণিত  তথ্য থেকে অনুমান অনুযায়ী  যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহণের দু  -তিনটি পথের সন্ধান পাওয়া যায়। অনুমান করা হয় ,তে কোন একটি  পথ দিয়ে তাঁরা পৌঁছে ছিলেন  যেখানে সেটিই স্বর্গ। সেই পদগুলি র একটা হল হর কা দুন উপত্যকার স্বর্গারোহণী পিক ধরেস্বর্গরোহিনী I, II, III এবং IV নামে চারটি  পৃথক শৃঙ্গের গ্রুপ এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যার মধ্যে স্বর্গরোহিনী  কে প্রধান শিখর হিসাবে বিবেচনা করা হয়। স্বর্গরোহিনী উচ্চতা 6252 m   । অনেকে র ধারনা এই পথে স্বর্গে আরোহণ হয়েছিল বলে পিকগুলির নাম স্বরগারোহণ পিক।

 তবে একটি কথা বলি ,আমরা সকলে বিভিন্ন যুক্তি সাজিয়ে যা বলি সেসব  হল অনুমানভিত্তিক ধারনা।   কোনটি বেশী যুক্তিগ্ৰাহ্য ,সেসব সিদ্ধান্ত পাঠক ই নেবেন।এই নিয়ে কোন জোড়াজুড়ি নেই। তবে এটা ঠিক সর্বজন স্বীকৃত কোন ধারণা আজও প্রতিষ্ঠিত হল না।

আর একটি পথ  হল বদ্রীনাথ পেরিয়ে মানাগ্ৰাম হয়ে শতপন্থ ট্রেকরুট। দীর্ঘ শাসনের পরে  পান্ডবরা   দ্বিধাহীন  চিত্তে ভারত ভ্রমণ শেষে স্বর্গে যাওয়ার বিষয়ে মনস্থ করেছিলেন।  সকল বাধা পেরিয়ে যুধিষ্ঠির নিজে  শুধু পৌঁছতে পেরেছিলেন। প্রচলিত অধিকজনস্বীকৃত  ধারনা অনুযায়ী বর্তমান উত্তরাখন্ডে অবস্থিত  চার ধামের অন্যতম বদ্রীনাথে  পেরিয়ে  মানা গ্রামকে পিছনে ফেলে যে  ট্রেকিং রুট আছে  পাহাড় ঘেঁষে সেই পথ ই নাকি মহাপ্রস্থানের পথ।কথিত আছে পাণ্ডবরা ওই পথেই স্বর্গে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন  পথ অতিক্রম করেই যুধিষ্ঠির  স্বর্গে পৌছেছিলেন। "মানাগ্ৰাম পেরিয়ে  শতপন্থ এই ট্রেক রুটএ শতপন্থ লেক এর পাশে প্রথমে  স্বর্গারোহণ স্টেপ। এটা প্রকৃত পক্ষে একটি গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ। বিশ্বাস করা হয় যে এই হিমবাহে স্বর্গে যাওয়ার সাতটি স্টেপ বা সিঁড়ি রয়েছে। এই হিমবাহের সৃষ্টি হয়েছে চৌখাম্বা (7068 m.) এবং বদ্রীনাথ (6974 m.) পর্বতশৃঙ্গ থেকে। হিমবাহটি 13 কিলোমিটার বিস্তৃত।  শতপন্থ লেক এর উচ্চতা মোটামুটি ভাবে 4600 m."

অর্থাৎ একই রাজ্যের (উত্তরাখণ্ড) দুই অঞ্চলে দুটি এমন জায়গা  ... তেই পথ দিয়ে গেলে  স্বর্গের ঠিকানা  মিলে  যেতে পারে ।  সবচেয়ে মজার কথা, দুই অঞ্চলের অধিবাসীদের এটাই স্থির বিশ্বাস যে তাদের ওখান থেকেই পান্ডবরা স্বর্গে আরোহন করেছিলেন। কিন্তু কোনটা ঠিক তার বিচার কে করবে?

এবার আসি তৃতীয় সম্ভাব্য রুটেকালীপ্রসন্ন সিংহ এবং হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের মহাভারত ঘেঁটে যা অনুমেয় ,সে পথ  অবশ্য আলাদা  হিমাচল হিমালয় পেরিয়ে লাদাখ মরুভূমি (লাদাখ হল শীতল মরুভূমি ) পেরিয়ে পান্ডবরা মহাভারত বর্ণিত সুমেরু পর্বত(লাদাখ পেরোলেই কারাকোরাম পর্বত,সম্ভবত একেই সুমেরু পর্বত বলেছেন হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ) পেরিয়ে স্বর্গে গিয়েছিলেন।এটা ঠিক ,মহাভারতে কিন্তু পরিস্কার উল্লেখ আছে .….পান্ডবরা হিমালয় অতিক্রম করে গেছিল। সুতরাং এটিও মহাপ্রস্থানের পথ হতে পারেআর লাদাখ পার হলে কারাকোরাম রেঞ্জ ,তারপর যেদিকে যাওয়া যায় সেটা হল তিব্বত মালভূমি। বিবরণের ধারা অনুযায়ী এখানেই  যুধিষ্ঠির স্বর্গে আরোহণ করেন। অর্থাৎ তাহলে  তিব্বত মালভূমি কিম্বা  পামির  পর্বতের আশেপাশে কোথাও হয়ত তৎকালীন স্বর্গের ঠিকানা হলেও হতে পারে। তুর্কীস্থান, থেকে সাইবেরিয়া পর্যন্তও তার সীমানা কিনা কে জানে।  কিছু বিবরণে মিল পাওয়াও যায়!

ঋকবেদ বলছে,  ' হিমালয়ের উত্তরে হেমকূট।তাঁর দক্ষিণে কিম্পুরুষবর্ষ।।হেমকূটের উত্তরে হরিবর্ষ। হরিবর্ষে র উত্তরসীমা  হল নিষধ পর্বত।নিষধ পর্বতের উত্তরে ইলাবৃতবর্ষ। ইলাবৃতের উত্তরসীমা  হল নীলাচল'।কালকূট(সমরেশ বসু )তাঁর 'শাম্ব 'বইতে  উল্লেখ করেছেন যে 'সম্ভবত বর্তমান মধ্য এশিয়ার পামীর পর্বতমালার  অন্তর্গত তুর্কীস্তান সংলগ্ন অঞ্চলই  ইলাবৃতবর্ষ' তাঁর  ব্যাখ্যায়,পুরাকালে ইলাবৃতবর্ষ অতি সমৃদ্ধ স্থান ছিল।পরে নানা প্রাকৃতিক দূর্যোগের ফলে নদনদী শুকিয়ে সভ্যতা লুপ্ত হয়।হয়ত তখনই মাইগ্ৰেটেড  হয়ে ছড়িয়ে পড়েন বিভিন্ন জায়গায়। তখনই হয়ত ভারতবর্ষে  আসেন।

কালকূটের অভিমতকে  গুরুত্ব দিয়ে আরও কিছু সম্ভাবনাকে সংযোজিত করতে পারি.... 'দেবগণ তাহলে হয়ত  মর্তের (পৃথিবী,পৃথ্বি রাজ্যের অধিবাসী) মানুষের আহ্বানে বা নিজেদের প্রয়োজনে ইলাবৃতবর্ষ থেকে কাশ্মিরের পথে পাঞ্জাব হয়ে বিন্ধাচলের উত্তর পর্যন্ত বসতি স্থাপন করেন'। দেবতাদের  আজও বাস্তব  অস্তিত্ব  বর্তমান আছে এই ধারনা  যদি  মেনে না নিই ,তবে ভারতীয়দের পূর্বপুরুষ  যে  দেবতারাই ,এটা মানলেও কোন অসুবিধে  নেই।কাশ্মিরকে  আজও কিন্তু লোকে পিতৃভূমি বলে  ।কারন ভারতীয় পূর্বপুরুষরা  এসে  (ইলাবৃতবর্ষ থেকে) সর্ব প্রথমে  কাশ্মীরে(অন্তরীক্ষ)  এসেই সম্ভবত  বসবাস  করা শুরু করেন। আর ইলাবৃতবর্ষ যেহেতু আদি বাসস্থান তাই সে পবিত্র ,তাই সে স্বর্গ নামে অভিহিত।  পুণ্যলাভ ও মুক্তির জন্য তাই স্বর্গারোহণ যাত্রা। যুধিষ্ঠির রাও তাই মুক্তির জন্যই স্বর্গ আরোহণ করেছেন। তখনো হয়ত  যাওয়ার পথ অত দুর্গম ছিল না!  এরপর যখন ইলাবৃতবর্ষে(স্বর্গে) যাওয়ার পথ  ক্রমেই দুর্গম হয়ে পড়লো, তখনই দিবি আরোহণ তত্ত্ব র ভিত্তিতে  হয়ত  কল্পনা করা হল ...."স্বর্গ হল মৃত পুণ্যাত্যাদের বাসস্থান ,দেবযান  হল নক্ষত্রবীথি" অর্থাৎ  স্বর্গপ্রাপ্তি হল মৃত্যুর নামান্তর !

















মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ