"সমাজ বিপ্লব"
একটু গভীরে গিয়ে যদি পর্যবেক্ষন করা যায় তাহলে দেখা যায় ...মহাকাব্যেরই মূল বিষয় কিন্তু প্রাচীন সমাজবিপ্লব অর্থাৎ সমাজের ভিতরকার পুরাতন ও নূতনের বিরোধ । প্রতি পদক্ষেপে আমলাতান্ত্রিক মতধারার পরিবর্তন।
রামায়ণের দিকেই আজ তাকাই ...
রামায়ণ কালে রামচন্দ্র পরামর্শ গ্ৰহনের ক্ষেত্রে তাঁর পিতৃপুরুষের বহু বছরের বিশ্বস্ত গুরু বশিষ্ঠর দিকে না গিয়ে নতুন পরামর্শদাতার নিয়ন্ত্রণে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ পরামর্শদাতা হিসেবে নূতন দলের পক্ষ নিয়েছিলেন। বশিষ্ঠের সনাতন ধর্মই ছিল রামের কুলধৰ্ম, বশিষ্ঠবংশই ছিল তাদের চিরপুরাতন পুরোহিতবংশ, তথাপি অল্পবয়সেই রামচন্দ্র সেই বশিষ্ঠের বিরুদ্ধপক্ষ বিশ্বামিত্রের মতকেই অনুসরণ করেছিলেন। বস্তুত বিশ্বামিত্র রামকে তাহার পৈতৃক অধিকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাম যে পন্থা নিয়েছিলেন তাতে দশরথের সম্মতি ছিল না, কিন্তু বিশ্বামিত্রের প্রবল প্রভাবের কাছে তাঁর আপত্তি টেকে নি।
মনে আছে নিশ্চয়ই ,বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রামচন্দ্র যখন বের হলেন তখন তাঁর তরুণ বয়স। দৈত্যদের নিগ্ৰহ থেকে উনি ঋষিদের মুক্তি দেবেন।ঐ বয়সেই তিনি তাঁর জীবনের তিনটি বড়ো বড়ো পরীক্ষায উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। প্রথম, তিনি শৈব রাক্ষসদিগকে পরাস্ত করে হরধনু ভঙ্গ করেছিলেন, দ্বিতীয়, যে ভূমি হলচালনের অযোগ্যরূপে অহল্যা হয়ে পাষাণ হয়ে পড়ে ছিল ( দক্ষিণাপথের প্রথম অগ্রগামীদের মধ্যে অন্যতম ঋষি গৌতম যে ভূমিকে একসময় গ্রহণ করে অবশেষে অভিশপ্ত বলে পরিত্যাগ করে যাওয়ায় যা দীর্ঘকাল ব্যর্থ হয়ে পড়েছিল,), রামচন্দ্র সেই কঠিন পাথরকেও সজীব করে তুলে আপন ভূমিকে কর্ষণযোগ্য করে কৃষিনৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছিলেন । তৃতীয়ত তিনি রাক্ষস-রাক্ষসীদেরকে পরাজিত করে মুনি-ঋষিদের যজ্ঞ কার্যাদি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতে যাতে কোন বাধা না থাকে তার ব্যবস্থা করলেন।
মিথিলা নগরীতে পৌঁছে বিশ্বামিত্র রামকে দিয়ে হরধনু ভঙ্গ করালেন এবং সীতার সাথে রামের এবং লক্ষ্মণের সাথে উর্মিলার বিবাহ দিলেন। রামের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কিন্তু গৃহীত হল রাজা দশরথ এবং বশিষ্ঠর থেকে পরামর্শ গ্ৰহনের আগেই। রচনাকার অবশ্য রাজা দশরথ ও কূলগুরু বশিষ্ঠর মান বাঁচানোর জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ সংগঠিত হ ওয়ার কিছু আগে তাঁদের মিথিলায় ডেকে আনার ব্যবস্থা করেন ।
পারিবারিক ঐতিহ্য, অনুশাসন, রীতি র বাইরে গিয়ে এও কিন্তু এক পরিবর্তন। যে পরিবর্তন রামচন্দ্র ও বিশ্বামিত্রের জুটিতেই সম্ভব হয়েছিল। এত পুরুষ ধরে চলে আসা প্রথা অর্থাৎ অযোধ্যার সকল সিদ্ধান্ত বশিষ্ঠের পরামর্শ ক্রমে সংগঠিত হত...তার পরিবর্তন।
এরপর যখন যৌবরাজ্য-অভিষেকের সময় এল, বাধা এসে পড়ল। বাধা দিল কে ? না বাধা দিল ,পিতৃ প্রতিশ্রুতি পালনের দায় ....।.. যাইহোক অবশেষে রামচন্দ্রের নির্বাসন ঘটল। রামচন্দ্রের এই যৌবরাজ্য-অভিষেকে বাধা ,বনবাস যাত্রা ,বনবাস যাত্রার পূর্বে পিতা দশরথের কাতর অনুরোধ -(--সিদ্ধান্ত বদলের জন্য), রামচন্দ্রের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা .... এসবের পিছনেও ছিল সনাতনী ও পরিবর্তনপন্থীদের মতদ্বৈততা । সহজভাবে বললে বশিষ্ঠ এবং বিশ্বামিত্রের রেষারেষি।
একটু যদি বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্ৰহনের বিষয়টি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যায় .....রামের বিরুদ্ধে যে একটি দল সক্রিয় ছিল তা সন্দেহাতীত — এবং স্বভাবতই অন্তঃপুরের মহিষীদের প্রতি তাদের বিশেষ প্রভাব ছিল। বৃদ্ধ দশরথ একে উপেক্ষা করতে পারেন নি। এই জন্য একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাঁর প্রিয়তম বীর পুত্রকেও তিনি নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হয়েছিলেন।।
আমার অনুমান ,মহাকাব্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ।মহাকাব্যে উল্লিখিত এই কূলগুরু ,কূলপুরোহিত.. জ্ঞানবান এই বয়োঃবৃদ্ধগণ( যেমন বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র ,অগাস্ত) এঁরা সম্ভবত সবাই ছিলেন আমলাবর্গের মধ্যে উচ্চপদস্থ এক একটি পদ। এঁরা সকলেই ছিলেন বিদ্বান,বুদ্ধিমান , চতুর এবং শান্তি প্রিয় ছিলেন এ কথা বলতে পারবো না । এই পদগুলিকে এখনকার সেক্রেটারি ,এডভাইসর,ডাইরেক্টর এইরকম বিভিন্ন পদমর্যাদার সঙ্গে তুলনা করা যেতেই পারে।আর এঁরাই নিয়ন্ত্রণ করে গোটা সিষ্টেমটাকে,আগেও তাই ছিল। এ যেন সনাতনপন্থী আর প্রগতিশীল পন্থীদের ক্ষমতা আয়ত্বকরণের লড়াই।
ব্যক্তি না-থাকলেও পদ থেকে যায় যুগে যুগে। সেই পদে অন্য নামে যোগ্যতম কোন ব্যক্তি আসীন হন। বশিষ্ঠ, বিশ্বামিত্র অগস্ত্য ইত্যাদি পদগুলি প্রাচীন যুগে হয়ত ব্রাহ্মণদের সর্বোচ্চ পদ ছিল। অসীম ক্ষমতা ভোগ করতেন তাঁরা।আমার মনে হয় , বশিষ্ঠ বা বিশ্বামিত্র একজন কোন ব্যক্তি নয় এগুলো পদ। বশিষ্ঠ রামচন্দ্রের চার-পাঁচ পুরুষ আগে থেকে অযোধ্যার কূলপুরোহিত। একজনের পক্ষে কি কখনো সম্ভব ....এতকাল ধরে? বিশ্বামিত্র নাকি রামায়নের সময়তেও ছিলেন আবার মহাভারতের ছিলেন?
আসলে এগুলি হল একেকটি পদ ! একেক পদের মতাদর্শ অপরের থেকে কোথাও কোথাও ভিন্ন। কেউ হয়ত সনাতনপন্থী,কেউ হয়ত প্রগতিশীল। চরিত্রের বিশ্লেষণের দ্বারা এটুকু বোঝা হয়ত সম্ভব, বিশ্বামিত্র ছিলেন প্রগতিশীল , পরিবর্তন পন্থী মতাদর্শের বিশ্বাসী। ভুলে গেলে চলবে না ....তিনিই সর্বপ্রথম দলিতদেরকে একত্রিত করে 'দশরাজার যুদ্ধ ' অর্গানাইজ করতে পেরেছিলেন। ক্ষত্রিয় হয়ে অধ্যাবসায়ের ফলে ব্রাহ্মণ হতে পেরেছিলেন।শ্রেণি পরিবর্তনের এ এক বিশেষ উদাহরণ। আবার ওদিকে বশিষ্ঠের নরমপন্থা , সনাতনী ভাবধারার ধ্ব্বজাধারী নীতিসমূহ সমাজের ঐতিহ্য রক্ষার ইঙ্গিতবাহী।
আজও কিন্তু সমাজে আমরা দেখি এই দুই ধারার কখনও মেলবন্ধন কখনও রেষারেষি।পুরাণে বর্ণিত বশিষ্ঠ ও বিশ্বামিত্রের বিরোধ গাঁথাও তাই আজকের সমাজেও এক বাস্তব অনুভূতি। মহাকাব্য তাই কালজয়ী।

0 মন্তব্যসমূহ