পরাজয়
ব্যস্ত কলকাতা শহরে পিউ জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। স্কুল কলেজ সবকিছুই কলকাতা শহরে। মা-বাবার একটিমাত্র মেয়ে পিউ। ভীষণ আদুরি একেবারে চোখের মনি। লেখাপড়ায় গান-বাজনায় সবদিক থেকে পিউর জুড়ি মেলা ভার। স্কুল-কলেজেও পিউকে সবাই বেশ ভালোবাসত।শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছেও সে ছিল প্রিয় পাত্রী। সে ছিল ভীষণ নরম মনের।
এম এর ফাইনাল ইয়ার তখন পিউ ঠিক করে এম.এ টা কমপ্লিট করে ,তার বরাবরই ইচ্ছে ছিল গান নিয়ে চর্চা করার।
তাই গানটাকেই তার ক্যারিয়ার করবে বলে সে ঠিক করে। অনেকগুলো রেকর্ডিং স্টুডিওতে তার গানের রেকর্ডিং পাঠিয়েছিল সিলেক্ট ও হয়েছে।
অনেক জায়গা থেকে। পরীক্ষা র শেষে একদিন রবিবারের ছুটির সকালে কোন প্রোগ্রাম ছিল না তার।সে ভাবলো যে একটু মন ভরে ঘুমাবে সেদিন। হঠাৎ ফোনের রিংটোন টা বেজে ওঠে ঘুমটা তার হঠাৎ করেই ভেঙে গেল। দেখল বিখ্যাত মিউজিক ডিরেক্টর মিস্টার সৈকত চৌধুরী তাকে একটা প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করার জন্য মেসেজ করেছে। ওই প্রোগ্রামে নির্বাচিত হতে পারলে পিউর নাম ডাক আরও বৃদ্ধি পাবে। সে প্রচন্ড খুশি হয়ে যায়। বাবা মা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে ভীষণভাবে সাপোর্ট করেছেন ।এবং তার পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন সবসময়।
পিউ সেদিন গানের অনুষ্ঠানে যায় এবং যথারীতি তার গান সবার বেশ ভালো লাগে।
ধীরে ধীরে শুরু হলো তার গানের জগতে প্রথম পদক্ষেপ।
সব সময় যে কোন কিছু কাজ করার আগে পিউ মিঃ চৌধুরীর সাথে আলোচনা করে নিত। ওনাকে ভীষণ শ্রদ্ধা ভক্তি করত সে।আর উনিও পিউকে অসম্ভব রকম গাইড করতেন।কোনটা ভালো কোনটা খারাপ সবকিছু।
পিউর সাথে কলেজ লাইফ থেকে একটা ছেলের রিলেশনশিপ ছিল। ওরা ঠিক করেছিল দুজনে বিয়ে করবে কিন্তু হঠাৎই সে মা-বাবার পছন্দ মত মেয়েকে বিয়ে করে নেয়। যেদিন জানতে পেরেছিল পিউ নিজেকে সেদিন সামলাতে পারেনি।
সামলাতে পারেনি সে। ইমোশন কন্ট্রোল করতে পারিনি সেদিন রাতে। স্টুডিওতেই কেঁদে ফেলেছিল সকলের সামনে। গ্রিনরুমে বসে মিঃ চৌধুরী সবটা বুঝিয়েছিলেন। অনেক মনবল জুগিয়েছিলেন।
বলেছিলেন পায়ের ক্ষত যেমন সাবধানে হাঁটতে শেখায় তেমনি মনের ক্ষত ভালো করে জীবনে বাঁচতে শেখায়।
পিউ বলেছিল সৈকত দা আপনি আজ না থাকলে আমি বোধহয় আজকিছু করে ফেলতাম।
ওনার কথাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করত পিউ। পিউর জীবন থেকে ভালোবাসা চলে যাওয়ার পর , সবকিছু থেকে দূরে একা একা থাকতো তাকে দেখে বোঝা যেত সে ডিপ্রেশনে ভুগছে।
কিছুই ভালো লাগতো না তার কোন কিছুর প্রতি আগ্রহ সে খুঁজে পেতে না সবকিছু কে বোঝা মনে হতে শুরু করলো একসময় ।
জীবনটা বয়ে নিয়ে যাওয়াটা তার ভীষণ কঠিন লাগতে শুরু করল.ঠিকমতো রেকর্ডিং এ যেত না। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করত না। মা-বাবা সবটাই লক্ষ্য করলো একসময় অনেকবার জিজ্ঞাসা করে ও মা-বাবাকে সঠিক কোন উত্তর সে দিতে পারেনি। কারণ মা বাবা জানত না যে সে কোন রিলেশনশিপে ছিল।
ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিতে বসেছিল প্রায়। কিছু একটা হচ্ছে সেটা বাড়ির লোক বুঝতে পারছিল। কিন্তু কি হচ্ছে সেটা অজানা থেকে গেছিল সবটা। জানতেন সৈকত দা আর পিউ র কয়েকটা বন্ধু। তিনি শক্ত হাতে রাস্ টেনে ধরার চেষ্টা করলেন।
একটা গুণী মেয়ে এভাবে শেষ হয়ে যাবে উনি মেনে নিতে পারলেন না ।
ওকে অনেক বোঝালেন। কাউন্সিলিং করলেন ।একদম বন্ধুর মত মিশতেন। সারাদিন পিউর কিসে ভালো হবে তাকে বোঝাতেন। কোথায় যেন সে সবটা বুঝতে পারল। আস্তে আস্তে পিউ।অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করলো ।সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করল কিন্তু কোথাও যেন অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটে যাচ্ছিল ।
পিউ কোথাও যেন সৈকত দার উপর ডিপেন্ডেবল হতে শুরু করেছিল।
কোথাও যেন ওনার সঙ্গ শান্তি দিতে শুরু করেছিল পিউর মনে।
পিউ সৈকত দার সমন্ধে কিছু জানেনা। শুধু জানে ওনার কোয়ালিফিকেশন আর উনি মিউজিক কম্পোজ করেন। ব্যাস এতটুকুই। বেশ নামডাক ওনার। অমায়িক ব্যাবহার ওনার। দেখতেও বেশ সুপুরুষ।
ওনার বাড়ির ঠিকানা জানা পিউর।ফ্ল্যাটে একাই থাকেন ব্যাস ।আর কিছু জানার কখনো সে চেষ্টা করেনি ।হয়তোবা জানার তার ইচ্ছে হয়নি। পিউ ক্রোমশই সৈকত দার দিকে দিকে দুর্বল হতে শুরু করে।
সে যেন কোথাও একটা ভরসার হাত খুঁজছিল।হয়তবা খুঁজছিল ভালোবাসা'র কাঁধ। অথবা মনের সবটা বলার মত কোনো একজন বন্ধু।
এমন সময় সেটা সে অনুভব করতে পারে কিন্তু যতবারই সে কথাগুলো সৈকত দাকে আকার ইঙ্গিতে বোঝাতে গেছে তার মনে হয়েছে যে সে কোনদিনও তার সেই ভরসার হাত টুকু হয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু তার কারণটা কি? সে কিন্তু জানে না ।
একদিন দুপুরবেলা, সৈকত দাকে পিউ হঠাৎই কথায় কথায় বলে ফেলে আপনি আমার পাশে থাকবেন তো সারা জীবন ।
ব্যাস আমার আর কিছু চাই না। কথাটা জানিয়ে ছিল মেসেজ করে ।কিন্তু ওই মেসেজের কোন রিপ্লাই আসে না। পিউ একটু অবাক হলো যে মানুষটা তাকে এত সাপোর্ট করতো এতটা পাশে থাকতো হঠাৎ করে এরকম চুপ কেন হয়ে গেল? পরদিন স্টুডিওতে পিউ লক্ষ্য করল যে সেভাবে উনি আর তার সাথে কথা বলছে না। পিউ মনের সব কথা সৈকত দাকে জানালো।বলল আমরা বন্ধুত্বের বেশি কিছু ভাবতে পারিনা সৈকত দা?
পিউ বিশ্বাস করত মনের কথা সবসময় পরিষ্কার করে বলতে হয়। কিন্তু সৈকত দার চুপ থাকা।
যেন তার বেশি করে মাথায় চেপে বসলো যে মানুষটা এতদিন তার সাথ দিচ্ছিল হঠাৎ করে সে মানুষটার কি হলো ?পিউ কি কোন অন্যায় করল ?কেন কি দোষ করল ?কেন কোন উত্তর নেই? বাড়ি ফিরে আবার টেক্সট করল ।
কি হয়েছে আপনি কেন আমাকে অ্যাভয়েড করছেন কেন?দেখল কোন রিপ্লাই এলো না। এবার একটু ব্যস্ত হয়ে উঠল সে বারবার একটা মানুষকে মেসেজ করল কিন্তু কোন রিপ্লাই পাওয়া গেল না ।
কিন্তু যে মানুষটা আগের দিন পর্যন্ত তার সাথে ভালোভাবে কথা বলেছে সে রাতারাতি কি করে বদলে গেল এভাবে?
ভাবলো এবার সবটা জানতে হবে। তার নীরবতার কারণ কি?স্টুডিও তো পরিচিত একজনকে জিজ্ঞাসা করেছিল।
কিন্তু সেও ঠিকমত কোন তথ্য তাকে দিতে পারল না। শুধু জানাতে চাইলো যে উনি কোনো রিলেশনশিপ এ আছেন কিনা তাও জানতে না পিউ।
ক্রমশই সৈকত দার ব্যবহারের মধ্যে সে আমুল পরিবর্তন দেখতে পেল। এতদিন তাকে যেভাবে পাশে পেয়েছে মানুষটাকে পরিবর্তন হতে দেখে পিউ ভেঙে পড়ল।
তার মনে হল একজন ভালো বন্ধুকে সে বোধহয় হারিয়ে ফেলছে।
তারই পরিবর্তন সে কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। স্টুডিও থেকে বাড়ি ফিরে এসে আবার একটা টেক্সট করল আপনার কি হয়েছে কেন এভোয়েড করছেন আমাকে? নো রিপ্লাই নো সিন কিন্তু কি করবে সে কিছুই ঠিক করে উঠতে পারে না ।সে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছিল দিন দিন সে পুরনো ডিপ্রেশন তাকে যেন আবার চেপে ধরছিল ।
ঝড়ে বিধ্বস্ত হয়ে যে মেয়েটাকে তিনি সামলেছিলেন ।ভরসা দিয়েছিলেন ।হঠাৎ সেই মানুষটা কেন পরিবর্তন হয়ে গেল ।পিউ পাগলের মত ব্যবহার করতে থাকে ।কিছু একটা যেনো তার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। ফোন করলে ফোন ধরতো না।
নম্বর ব্লক। পিউ অন্য অনেক সিম থেকে ফোন করে কথা বলতে চেয়েছিল । কিন্তু সবকিছু কে সে অস্বীকার করে।
পাগলামী র সীমা ক্রমশ বাড়তে থাকে। একসময় এক বন্ধু মারফত হুমকি আসে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কি অপরাধ তার। শুধু অপরাধ টুকু জানতে চেয়েছিল।দায় চাপাতে চায়নি।বিরক্ত করতেও চায়নি।
হয়ত সে কোনো রিলেশনশিপ এ ছিল অথবা ছিল কোনো অতীতে জর্জরিত। কিন্তু তবে বলছে না কেন পিউকে।কেন সবটা বলে দিচ্ছেনা?কি সমস্যা।চুপ থাকাটা কোন সমাধান নয়।
এতটা যন্ত্রনা তার আগের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াতে হয়নি। এত কষ্ট হয়নি।কি যেন একটা হারিয়ে ফেলছে সে। বন্ধু নাকি ভালোবাসা কোনটা সে জানেনা শুধু জানে সৈকত দাকে মনের সবটা বলে তার মন হালকা হত। ভালোবাসা না থাকলেও কি বন্ধুত্ব টাও কি হারিয়ে যাবে?
তার কেরিয়ার তার গান তার কিছু ভালো লাগছে না ।।কিসের পিছনে ছুটছে সে ?একটা ভালোবাসা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে,সেই ভাঙা হৃদয়টা নিয়ে যে তাকে সাহারা দিয়েছিল যাকে আঁকড়ে ধরে সে বাঁচতে চেয়েছিল ,সেখান থেকেও এভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে সে কিভাবে বাঁচবে সে বুঝতে পারছিল না ।
কিন্তু যথাযথ কারণটা তো সে জানে না পরিষ্কার করে কিছু না বললে তাহলে সে জানবে কি করে?কি করে জানবে সে কি চায় ।
তাহলে অদম্য শ্রদ্ধা ভক্তি ভালবাসা কি সাহারার রূপ নিয়েছিল ?আশ্রয়ের রূপ নিয়েছিল কোথাও ।হাজারটা প্রশ্ন তার মনে উঠতে থাকে ।প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে সে পাগলের মত ছুটে যায় সৈকত দার বাড়িতে।
বেল বাজাতে ভিতর থেকে একজন দরজা খুলে বলে বাড়িতে কেউ নেই । কিন্তু সাদা গাড়িটা বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়েছিল ।সব কিছু পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে তার কাছে ।
সৈকত দা কে ফোন করে। ফোন রিসিভ করেন না। তারপর টেক্সট করে টেক্সটেরও কোন আনসার নেই ।তার রাগ অভিমান দুঃখ আরো বাড়তে থাকে। কিন্তু কেন করছেন ?এরকম কথা না বললে কি করে পরিষ্কার হয় সব কিছু ?
সে বুঝতে পারল না ।কারণ যদি কোন অসুবিধা থাকে মানুষ তো মানুষের সাথে কথা বলে। কথা বলে সমস্তটা পরিষ্কার করে, কেন পরিষ্কার করছেন না ?কেন বলতে পারছেন না ?পিউ ই বা কেন এরকম পাগলামি করছে সেও বুঝতে পারছেন না ।কি যেন একটা হারিয়ে ফেলার ভয়। কি হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না ।
আস্তে আস্তে দুটো ডাবল টিক থেকে টিক মার্ক টা সিঙ্গেল হয়ে গেল ।
তখন সে তার উত্তরটা পেয়ে গেল হঠাৎ পায়ের নিচ থেকে জমিটা তার সরে যায় কি এমন করল সে কিসের এত দূরত্ব সে বুঝতে পারল না ।
একরাশ মন খারাপ যেন তাকে চেপে বসলো। কি দোষ তার কি ভুল কিচ্ছু জানা নেই ।কোন রকম সেই রাতটা সে কাটলো। পরদিন স্টুডিওতে গিয়ে তার চোখ ওই একজনকেই খুঁজতে শুরু করল ।
দেখল গ্ৰীন রুমের সামনে সৈকত দা। পিউ ছুটে গেল।বলল কি করেছি আমি?কেন এমন করছেন আমার সাথে?
চরমতম অপমান করে বেরিয়ে যেতে বলল সৈকত দা পিউকে।
একঘর লোকের সামনে।
কেউ কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কি হলো।একটা মানুষ সে ভেঙে যাওয়ার পরে তার এতটা সাহারা যে হয়েছিল ;তাকে জীবনে একটা পথ বলে দিয়েছিল; তাকে জীবনে দাঁড়াতে সাহায্য করছিল ;হঠাৎ করে নিজের দুর্বলতা বুঝতে পারার পরে তাকে কোন কিছু না বলে ;তাকে কি করে এটা এতটা এভোয়েড করতে পারে ?
পিউ র কাছে কিছুতেই ক্লিয়ার হচ্ছিল না।একটা ঘরের মধ্যে অন্ধকারে কাটতো সে
।একটা সুস্থ সবল স্বতঃস্ফূর্ত মেয়ে পরিণত হতে থাকে একটা মানসিক রোগীতে।
মা-বাবা কারণটা কিছুটা আজ করতে পেরেছিল ।কিন্তু সম্পূর্ণটা বুঝতে পারেনি। কাউকে কিছু সে বলতে পারছিল না ।
একটা মানুষের প্রতিবন্ধকতা থাকতেই পারে। একটা মানুষকে আরেকটা মানুষের জীবনসঙ্গী হিসেবে ভালো নাই লাগতে পারে ।কিন্তু যাই হয়ে যাক কথা বলাটা প্রয়োজন ।
ভালোলাগা খারাপ লাগা সবটা জানানো প্রয়োজন। একটা মানুষের প্রতি একটা মানুষের দুর্বলতা থাকতেই পারে।
তাকে ভালো লাগতে পারে ;তার কথা ভালো লাগতে পারে। তার ব্যক্তিত্ব ভালো লাগতে পারে। অপরজনেরও যে ভালো লাগবে এমন কোন কথা নেই ।
কিন্তু ভালো লাগা খারাপ লাগা যখন কেউ প্রকাশ করে ,সম্মতি অসম্মতি দুটোই কথাতে জানাতে হয়।
নীরবতা এড়িয়ে যাওয়া এগুলো কোনদিনও কোন সাহসিকতার পরিচয় দেয় না।
নীরবতা অপর মানুষের ইমোশনটাকে হার্ট করে। মানুষ কথার প্রেমে বেশি পড়ে ।
কথা মানুষের মনকে শান্তি দেয়। কোন মানুষের কথা যখন একটা মানুষের মনকে শান্তি দেয় ;সে চায় তার ভালো লাগা খারাপ লাগাটা তার মুখ থেকে শুনতে ।
তখন ঐ মানুষটার সাথে কথা বলতে হয় ।নিরব থেকে বোঝা যায়না। বোঝানো যায় না নিজের অনুভূতিটা।
কথা বললে একটা মানুষ শান্ত হয়। একটা মানুষের মন শান্ত হয়। ভালো মন্দটা কথা বলেই তাকে বোঝানো উচিত।
কিন্তু কেন তিনি কোন কথা বলতে চাইলেন না পিউ সেটার কারণটা বুঝতে পারল না।
তাই সে ভেঙ্গে পড়েছিল ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছিল ।
একটা মানুষের জীবন মরণাপন্ন যেখানে হতে চলেছে সেখানে বোধহয় ইগো আত্মসম্মান এগুলো কোন কাজ করে না। যথারীতি বাড়িতে ডাক্তার এলো মানসিক রোগের চিকিৎসা শুরু হলো।
কিন্তু কোন কাজ হলো না ধীরে ধীরে ওষুধের ডোজ বাড়তে শুরু করলো, ওষুধের উপর ওষুধ ওষুধ ওষুধের উপর ওষুধ । কিন্তু কিছু তেই সে কাউকে কিছু বলতে পারল না গান ক্যারিয়ার সবকিছু ভুলতে বসেছে ।
ডাইরি লেখা র ভীষণ অভ্যেস ছিল তার। তো বাড়ির লোকেরা কিছুটা ডায়েরী ঘেঁটে কিছুটা বুঝতে পেরেছিল কিন্তু সম্পূর্ণটা নয় সৈকত দার নামটা দু-একবার ডায়রিতে উল্লেখ ছিল। তো সেখান থেকে খোঁজ নিয়ে তারা ওনার সাথে দেখা করলেন।
চেনাশোনা বন্ধু-বান্ধব তাদের সঙ্গে দেখা করলেন সে কেন এমন করছে, কি কারণ এত ভেঙে পড়ার? সেটা কেউ বুঝতে পারল না সবটা ধোঁয়াশা।
পিউর অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে শুরু করল সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে ।তাকে আ্যসাইলামে পাঠাতে হয় ।
সেখানেও তার অবস্থা ডিটোরিয়েট করে।
মা বাবার একমাত্র মেয়ের এরকম পরিস্থিতি দেখতে তাদের ভীষণ কষ্ট হয়। কিন্তু কি কারনে সে এত ভেঙে পড়েছে সে কাউকে বোঝাতে পারে না। ভালোবাসা বোধহয় একটা মানুষকে এতটাই ভেঙে দেয় ;কাউকে আঁকড়ে ধরতে চাওয়া আর তার নীরবতা বোধহয় একটা মানুষকে এতটাই ভেঙে দেয়।
ডঃ সেন চিকিৎসা করে পিউ র মুখ থেকে ও নামটা বার করেছিলেন।মা-বাবাকে বলেন মিস্টার চৌধুরীকে একবার দেখা করতে বলুন। কথা মত তার মা বাবা মিঃচৌধুরী র সঙ্গে দেখা করেন।
কিন্তু তিনি আসতে চাননি ।
পিউ র মুখোমুখি হতে চাননি।
কিন্তু কেন? কীসের ভয়?কী আছে তার অতীত কারো জানা নেই।
কিসের ভয় তার ?কি লুকাতে চেয়েছেন? হঠাৎ এই বদলে যাওয়াটা কে পিউ কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি।
তিনি তার মা-বাবাকে একটাই বলেছেন; যে আমার সাথে তো ওর এমন কোন রকম কোন কথা বা কোন রিলেশন হয়নি ;যেখানে ও এতটা ভেঙে পড়তে পারে।
সত্যিই হয়তো হয়নি ।পিউ হয়তো ভেবেছিল; হয়তো কাউকে জীবনে দাঁড়ানোর জন্য ভরসা দেওয়ার জন্য আশ্বস্ত করা বা ভালোবাসাটা বা পাশে থাকাটা হয়তো ভালোবাসা নয় ।
হয়তো স্নেহ হয়তো মায়া হয়তো মমতা ।
কিন্তু অপরদিকে যে ভেঙে চুড়ে শেষ হয়ে আছে সে হয়তো তাকে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে। সে হয়তো তার স্নেহ ভালোবাসার মধ্যে প্রকৃত ভালোবাসা খোঁজার চেষ্টা করেছে।ভুলটা তার।
আমরা জীবনে যত বড় ক্যারিয়ারই করি যত অর্থ উপার্জন করি দিন শেষে আমাদের একটা ভালোবাসার মানুষের দরকার হয়। দিনশেষে মনে হয় যে কেউ অসুস্থ হৃদয়ের যত্ন নিক ।
কেউ পাশে থাকুক। কেউ আমার মতো করেই আমাকে ভালোবাসুক। তাই হয়তো তার এত দুর্বলতা ।অনেকবার রিকোয়েস্ট করার পরে উনি রাজি হলেন দেখা করতে।
পরদিন সকালে সৈকত দা এলেন পিউর সঙ্গে দেখা করতে। যে মানুষটাকে দেখার জন্য যে মানুষটার কথা বলার জন্য পিউ এতদিন অপেক্ষা করেছে কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার সে সামনে আসার পরে পিউ তাকে চিনতে পারল না।
যার সাথে একটিবার কথা বলবে বলে যার মনের কথাটা একবার শুনবে বলে সে পাগলের মতো ছটফট করেছে। সে মানুষটাকে সে চিনতে পারল না।
ডাক্তার বাবু বললেন তুমি তো এনাকে দেখতে চাইছিলে না ?সব সময় তুমি বলতে না এনার কথা?
তুমি কি ওনাকে ভালোবাসো? পিউ র জবাবে সবাই থমকে গেল।পিউ বলল, আমি যাকে ভালোবাসি এ তো সে নয়, চরম পর্যায়ে ভালোবাসা একসময় বোধহয় মানুষকে সত্যি ই সবকিছু ভুলিয়ে দেয়। পিউর অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল। যে সে সৈকত দাকে
ভুলে গেছে। সামনে আসার পরেও সে তাকে চিনতে পারেনি।
যার সাথে কথা বলার জন্য; যার সাথে দেখা করার জন্য সে এত পাগলামি করেছে এত ছুটে ছুটে গেছে সে যেদিন সামনে এলো ;তাকে চিনতে পারল না।
সম্পূর্ণটা ভুলে গেছে ।তার অবচেতন মনে রয়ে গেছে সেই স্মৃতিগুলো। তার অবচেতন মনে রয়ে গেছে সেই ভালোবাসা।
তার অবচেতন মনে রয়ে গেছে তার পাগলামি গুলো ।সে জানে সে কাউকে ভালোবাসে। সে জানে সে কাউকে পাগলের মত চায়। সে জানে সে কাউকে কোন একজনকে ছাড়া সে বাঁচবে না। কিন্তু সে কে?
সে কে ?সে যখন সত্যি সত্যি সামনে এসে দাঁড়ালো পিউ তাকে অ্যাভয়েড করল ।হাঁ করে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল আপনাকে তো আমি চিনি না আপনি কে?
সব থেকে বড় পরাজয় বোধহয় সৈকত দার জীবনে এটাই ছিল। জীবন তাকে কতটা পরাজিত করেছে জানা নেই ।কিন্তু যখন কেউ কাউকে ভালোবাসে সে ভালোবাসা মানুষের সামনে যখন পরাজয় হয় সেটা বোধহয় জীবনের সব থেকে বড় পরাজয় ।
কেউ যদি ভালো না বাসে তার বোধহয় কোনো শাস্তিও নেই।
সম্পূর্ণ তার নিজের অনুভূতি ।
পিউ কিছুতেই স্বীকার করলো না সৈকত দাকে। সে যাকে ভালোবাসে বা সে যার জন্য আজকে তার এই অবস্থা সে ওই মানুষটা সে নয়।
নিজেকে অপরাধী মনে হতে শুরু করল সৈকত দার। একটা সুস্থ স্বাভাবিক মেয়েকে যেন সে আবার আবার কালো অন্ধকারের মধ্যে ঠেলে দিয়েছিল। তার ভালো চাইতে গিয়ে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল তার নীরবতা।
হাসপাতালে রুম থেকে সে বেরিয়ে চলে আসছিল। পিউ এক দৃষ্টিতে তার থেকে তাকিয়ে রইল চোখ থেকে অনবরত জল পড়তে শুরু করল তার। শুধু একবার ফিরে তাকালেন সৈকত দা।
পিউ কি সত্যিই চিনতে পারেনি ? নাকি তাকে অস্বীকার করাটাই তার ভালোবাসার সব থেকে বড় প্রমাণ দিয়ে গেল এই উত্তর জানা নেই কারো। আসলে কিছু উত্তর অজানা থাকাই ভালো।
.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ