মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

যুক্তি দিয়ে পুরাণ ও মহাকাব্য চর্চা পর্ব ৩ -ভগীরথের মর্তে গঙ্গা আনয়ন / প্রবীর দে




ভগীরথের  মর্তে গঙ্গা আনয়ন

 

ভগীরথ গঙ্গাকে মর্তে এনেছিলেন। সভ্যতা গড়ার ক্ষেত্রে গঙ্গার আগমণ এবং  ভগীরথের  অবদানের কথা  পুরাণ, বেদ দ্বারা স্বীকৃত। গঙ্গাকে আনয়ন(সংস্কার!)করে এবং সাগর (গঙ্গা সাগর) পর্যন্ত সুদীর্ঘ পথে তাঁকে  নিয়ে এসে একটা সভ্যতা  গড়ে তোলা ....এ  সফলতার কারিগর কিন্ত  ভগীরথ একা নন।।  তাঁর পূর্ব পুরুষ  সগর বংশের এটাই ছিল মহান কীর্তি। সবাই ভগীরথের কথাই জানে। তিনি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে   পূর্বপুরুষের  ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে পেরেছিলেন বলেই পরবর্তী প্রজন্ম গঙ্গাকে খাল কেটে  সুদীর্ঘ পথে সাগরের সাথে  মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন !

রামের পূর্বপুরুষ সগর ৯৯ বার অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন। শততম যজ্ঞের সময় দেবরাজ ইন্দ্র ঈর্ষান্বিত হয়ে ঘোড়াটিকে অপহরণ করে কপিলের আশ্রমে রেখে গেলেন। মনে রাখা প্রয়োজন ,স্বর্গের নদী গঙ্গার মর্ত্যে অবতরণের কাহিনিতে কপিল কিন্তু  একজন প্রধান চরিত্র। যাইহোক ,সগর রাজা তাঁর  বংশধর পুত্র অসমঞ্জ এবং অন্যান্য ষাট হাজার পুত্রকে পাঠালেন ঘোড়ার খোঁজে। এখানে একটা বিষয় লক্ষনীয় মহাকাব্যে র রচনাকার হয়ত   সাগরের নিজের ছেলে বোঝানোর জন্য বংশধর পুত্র  উল্লেখ করেছেন। ষাট হাজার পুত্র তাহলে আদতে ষাট হাজার অশ্ববাহিনী সেনা!   এটা হয়ত লেখক  সূত'র মহানুভবতা। তিনি হয়ত প্রগতিশীল ছিলেন তাই সৈন্যরাও রাজার পুত্র,আর রাজার নিজপুত্র হল বংশধর পুত্র। এক্ষেত্রে সূত কারা সেটি জানানো প্রয়োজন।পুরাকালে রাজার ইতিবৃত্তকার থাকতেন।রাজার নিজস্ব  মাহিনা করা ইতিবৃত্তাকারকে বলা হত মাগধ। আর এই মাগধের থেকে তথ্য নিয়ে বিবরণ লিখতেন যারা তাদেরকে বলা হত সূত। এরা  মিথ্যাকে কাটছাঁট করতে পারতেন। নিজের মতামত অনুযায়ী  লিখতে পারতেন স্বাধীনভাবে।আর  এই সূতদের  বিবরণ ই পুরাণের মূল ভিত্তি। সুতরাং ষাট হাজার পুত্রদের পরিচয় অনুমিত।

 তাই সেই  অসমঞ্জ ও সাথীগণ ঘোড়ার খুরের চিহ্ন দেখে অবশেষে পৌঁছলেন  কপিলের কাছে‌ ।অসমঞ্জ কপিলের সম্বন্ধে কিছু না জেনে ঘোড়া  চোর রূপে তাঁকে ধরতে গেলেন।  সঙ্গে সঙ্গে ই কপিলের রোষাণলে অভিশপ্ত হয়ে মারা গেলেন সকলেই। কপিল কে  জানা আছে নিশ্চয়। না হলে বলি ..... কপিল মুনি হলেন একজন বৈদিক ঋষি যিনি সাংখ্য দর্শনের প্রবর্তক। সাংখ্য হচ্ছে ভারতীয় ষড়দর্শনের মাঝে একটি আস্তিক্যবাদী দর্শন। ভাগবত পুরাণে এই দর্শনের আস্তিক্যবাদী ধারাটির উল্লেখ পাওয়া যায়। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, তিনি ব্রহ্মার পৌত্র মনুর বংশধর।  কপিল ক্ষমতাধারী,সে খবর তো আগে থেকে না নিলে যা হয়! এক্ষেত্রেও তাই! আর এজন্যই হয়ত পুরোনো প্রবাদ  আছে গঙ্গাসাগর গেলে ফিরে আসার চান্স কম।

 ভগীরথের দাদুর নাম ছিল  অংশুমান। সগরের পুত্র হল অসমঞ্জ,তাঁর ছেলে অংশুমান।অংশুমানের ছেলে দিলীপ,আর তার পুত্রের নাম  ভগীরথ। অসমঞ্জ অভিশপ্ত হয়ে মারা যাবার পর সগর তার নাতি অংশুমান কে পাঠালেন ঘোড়ার খোঁজে। অংশুমান বুদ্ধিমান,সে  কোন বিরত্ব দেখানোর চেষ্টা না করে  কপিলের কাছে এসে  তার পিতা (সগরের বংশধর পুত্র)এবং ষাট হাজার অশ্ববাহিনী (সাগরের পুত্র) দের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন। কপিল প্রসন্ন হয়ে বললেন,, স্বর্গের নদী গঙ্গা নেমে এসে তাঁদের ভস্ম স্পর্শ করলে তবেই তারা প্রাণ ফিরে পাবেন।

সেই থেকেই হয়ত  খাল খনন শুরু। প্রথমে অংশুমান,তারপর দিলীপ ,অবশেষে সফল হলেন ভগীরথ। ভগীরথের সময়ে সম্পূর্ণ হল তাই  গঙ্গার নাম  হল ভাগীরথী । আর সগরের নাম অনুসারে সমুদ্রের আর একটা নাম হল সাগর।কালক্রমে ঐ জায়গা তাই গঙ্গাসাগর। পবিত্র তীর্থস্থান।

তবে একটা কথা বলি,    ভগীরথের দৃঢ়সংকল্পতা,অধ্যাবসায়,এবং  ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা যে অসাধারণ ছিল এটা অনুমেয় ।তাই কৃতিত্বের সবপ্রচারটুকু  তিনিই পেয়েছেন।

যদিও  পৌরাণিক উপাখ্যানকে  মেনে নিতে  আমার কোন বাধা নেই  যে ভগীরথ  কঠোর তপস্যা করে গঙ্গাকে তুষ্ট করেন এবং গঙ্গা ভগীরথের তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে যখন  তাকে বলেন যে তিনি স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবতরণ করার সময় তার প্রপাতের প্রচণ্ড বেগ নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন গঙ্গা দেবী ভগীরথকে ভগবান শিবের তপস্যা করতে বলেন। কারণ গঙ্গা (দেবী) যখন মর্ত্যে অবতরণ করবেন,তখন তাকে ধারণ করার মতো শক্তি শুধুমাত্র মহাদেবেরই রয়েছে। এরপর ভগীরথ ভগবান শিবের তপস্যা আরম্ভ করেন ও তাকে গঙ্গাধারণের প্রার্থনা করেন। ভগবান শিব তখন ভগীরথের প্রার্থনা শোনেন ও স্বর্গ থেকে পতিত গঙ্গা দেবীকে তার জটায় ধারণ করেন ও নদীরূপে মর্ত্যে বাহিত করেন ।রিয়ালিষ্টিক সেন্সে একে আমি টানেল সিস্টেমের দ্বারা এবং বাঁধের দ্বারা জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সাথে  মেলাতে পারি হয়ত.।

গঙ্গার সুফল এতকাল ধরে  যে আমরা ভোগ করি তার কৃতিত্ব অবশ্য ই ঈক্ষাকু বংশের প্রাপ্য।কত যে  দূরদর্শী ছিলেন তাঁরা....!




মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ