মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

শনি রবির সাহিত্য বাসর-গল্পঃ টক ঝাল মিষ্টি / সাঁজবাতি





টক ঝাল মিষ্টি / সাঁজবাতি

তখন শরৎকাল। পুজোর মাস।"ঐক্যতান সংঘ" পাড়ার ক্লাবে ধুমধাম করে প্রতিবার দূর্গা পুজো করা হয়। ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও করাহয় প্রতিবার।
ক্লাবের সেক্রেটারি বাবাই দা। ভালো নাম পীজুষ রায়চৌধুরী। সকলে তাকে বাবাই দা বলে ই ডাকে।
ভীষন ভালো ছেলে। ভীষন কাজ করে ক্লাবের জন্য। আই.টি তে কর্মরত। সদ্য জয়েনিং। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ক্লাবের দায়িত্ব সামালাতে হয় তাকে। সকলে তাকে ভীষণভাবে মেনে চলে। উঁচু লম্বা ,ফর্সা , চোখে রিমলেস হালকা ফ্রেমের চশমা। ভীষন হ্যান্ডসাম দেখতে।বাবাই দা ছিল পাড়ার অনেকের হার্টথ্রব।

বাবাই দা দের বাড়ির কিছুটা দুরে  ও এক ই পাড়ায় বাড়ি ছিল মিঠাই দের। মিঠাই ভীষন দস্যি একটা মেয়ে। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ন। মুখশ্রী মিষ্টি। টম বয় ধাঁচের তৈরি মিঠাই। ছোটো  চুল আর জিন্স টপে সে অভ্যস্থ। বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে।তাই ছেলেদের মত করে সে মানুষ হয়েছে। সারাদিন ক্রিকেট নাহলে ব্যাটমিন্টন নিয়ে ব্যস্ত। পড়াশোনায় নেহাত খারাপ না। কিন্তু খেলাধুলা প্রতি ভীষন নেশা। সে ভীষন সাহসী।সবকিছু করতে পারে। টু হুইলার ,ফোর হুইলার সকলকিছু  সে চালাতে পারে। তবে মায়ের শখের কারণে ক্লাসিক্যাল ডান্স তার শেখা ।সে বেশ ভালো ই করে নাচটা। অনেক কঠিন কাজ ও সে করে ফেলে অনায়াসেই। 

পৃথিবীর কোনো কিছু তেই তার খুব একটা ভীতি নেই।

তার ভয় শুধু একজনকেই। বাবাই দাকে। ছোট থেকে বাবাই দা তার ক্রাশ।  বাবাই দা সামনে এলেই কেমন যেন থমকে যায় সে। লজ্জা লজ্জা মুখ হয়ে যায়।কথা জড়িয়ে যায়।
বাবাই দা হয়ত তাকে বোনের চোখেই দেখে। পাড়ার মেয়ে এই আরকি। বাবাই দা র চোখে অন্যকিছু কখনো সে দেখেনি।

প্রেম ভালোবাসা অতকিছু মিঠাই বোঝেনা।
 শুধু বাবাই দাকে দেখলে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে । বাবাই দাকে দেখলে তার হার্টবিট বেড়ে যায়।

বাবাই দা সামনে এসে মাথায় একটা চাটি মেরে বলে,"কি করে পড়াশোনা কেমন চলছে"?
মিঠাই লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে ,"ভালো"।
এর বেশি আর কিছু না।
তারপর বাবাই দা চলে যায় আর
।যতদুর দেখা যায় ততদুর বাবাই দাকে চেয়ে চেয়ে মিঠাই দেখতে থাকে।
 মিঠাই তখন গ্ৰাজুয়েশন থার্ড ইয়ারে।

মিঠাই জানে না কেন বাবাই দাকে দেখলে তার ইহকাল পরকাল সব এক হয়ে যায়? কেন?সে কি বাবাইদা কে ভালোবাসে ?তার উত্তর সে জানেনা।

 কিন্তু তারপর সব ভুলে যায় আর ক্রিকেট খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পাড়া থেকে আয়োজিত মেয়েদের ক্রিকেট খেলায় সে ফার্স্ট প্রাইজও পেয়েছিল।

দেখতে দেখতে পুজো চলে এলো পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হলো রীতিমতো ।
মিঠাই খুব ভালো নাচ করে। কিন্তু এর আগে কখনো পাড়ায় সে অনুষ্ঠান করেনি। 
মায়ের শখ । তাই সেবার মা জোর করে মিঠাইয়ের নামটা পাড়ার অনুষ্ঠান দিয়ে দিয়েছিল।
 অষ্টমীর দিন সন্ধ্যা বেলা হলুদ শাড়ি পড়ে "ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়"  নাচ টির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল ।

মিঠাই স্টেজের সামনে এলে হঠাৎ বাবাইদার মুখোমুখি হয়ে যায়।
দুচোখ তার লজ্জায় কেমন একটা নুঁয়ে গেল। এমন সাজে সে মিঠাইকে এর আগে দেখেনি কখনো । বাবাই দার পরনে ছিল হলুদ পাঞ্জাবি।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে বাবাইদা বললো ,"বলল বাহ! বেশ লাগছে তো তোকে"। 
কমপ্লিমেন্ট পেয়ে আনন্দে কি করবে মিঠাই ভাবতে পারছে না । মনে হচ্ছে আনন্দে সে সব নাচ ভুলে গেছে।
শেষ পর্যন্ত খুব সুন্দর অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল সেদিন। রাত্রিবেলা বাড়ি ফিরে শুধুই একটা কথাই মনে পড়ছিল তার। ঐ বাবাই দার বলা সেই কথাটা।
হঠাৎ একটা টেক্সট এলো হোয়াটসঅ্যাপে । দেখলো বাবাই দার নাম্বার ।
ওর কাছে সেভ ছিল নাম্বারটা কিন্তু কোনদিনও টেক্সট বা কল আসেনি ওই নাম্বারে। মিঠাই ভাবেনি ওই নাম্বারে কোনদিনও টেক্সট বা কল আসতে পারবে বলে।
 বাবাই দা লিখেছে,"তোকে আজ ভীষণ সুন্দর লাগছিল"। 
মিঠাই কি বলবে বুঝতে  না পেরে বলল,"থ্যাঙ্ক ইউ বাবাই দা"। 
কিছুক্ষন পরে আবার টেক্সট এল,"কাল খেলার মাঠে একবার দেখা করিস তো পাঁচটায়"। তোর কি প্র্যাকটিস আছে কাল?

মিঠাই কাঁপা কাঁপা হাতে টাইপ করল," কাল নবমী প্র্যাকটিস নেই। তবে তুমি যখন ডাকছো যাব"।

কিছুক্ষন পর টেক্সট এল "দেরি করিসনা কিন্তু"।

মিঠাই র সামনে এবার যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরছে। সে যা ভাবছে সেটা কি ঠিক? মেয়েদের সিক্স সেনস্ ভীষন কাজ করে।
তবে কি তার স্বপ্নটা সত্যি হতে চলেছে? আবার পরক্ষনে মনে হল না না এসব কিছু নয়। কোথায় বাবাইদা আর কোথায় মিঠাই। 
বোধ হয় ক্রিকেট বা অন্য কোন খেলার প্রোগ্রাম আছে তাই মিঠাই কে ডেকেছে। কিন্তু মনের ভেতর চলতে থাকে তোলপাড়।

পরদিন সকালটা কাটে কোনোমতে। বিকেল হতেই বাড়ির কাছে খেলার মাঠে  ঠিক সময়ে পৌঁছে গেল মিঠাই । দেখলো বাবাই দা নীল রংএর এর বাইকটাকে সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কি  যে বলবে বুঝতে না পেরে এগিয়ে গেল বাবাই দার সামনে। বলল ,"বল কি দরকার"?
বাবাইদা, কিছুক্ষণ মিঠাই র দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে
বলল ,"তোকে  ভীষন সুন্দর লাগছিল  কালকে । তুই যে এত সুন্দর নাচ করিস আমার তো জানা ছিল না "।
মিঠাই ভিতরের ঝড় সামলে বললো, "ওই আর কি। মায়ের ভীষণ ইচ্ছে আমি নাচটা করি  তাই"‌।
চুপ থেকে কিছুক্ষণ হট করে বাবাইদা বলল, "আজ সন্ধ্যে তে কি করছিস? কোথাও বেড়ানোর প্ল্যান নেই"?
মিঠাই এবার যেন ভয়ে জড়সড়ো হয়ে বলল, "যাব তো বাবার সাথে বেরাবো একটু"।
বোকা বোকা শোনালো কথাগুলো ভীষণ। তারপর বাবাই দা বলল ,"যা বাড়ি যা সন্ধ্যে হয়ে আসছে ঘুরে আয় কাকুর সাথে"।

কিছু বুঝতে না পেরে মিঠাই বাড়ি চলে এলো। সেদিন আর কোথাও বেড়ানো হলো না মিঠাইয়ের ।চোখে বাবাই দার মুখটা ভেসে এল বারবার । কি হল, কেন হল সে কিছুই বুঝতে পারছিল না।

সব ঘুরছে চোখের সামনে কি হয়েছে সে কিছু বুঝতে পারছে না। কারো সাথে কথাগুলো শেয়ারও করতে পারছে না। এভাবে কেটে গেল দুটো দিন আর কোন টেক্সট নেই কোন কল নেই। মিঠাইও টেক্সট করেনি কোনো।

দশমি চলে গেল। মায়ের বিসর্জন হয়ে গেল। ঐ নাম্বার থেকে আর কোন টেক্সট আসেনি। মিঠাই মনে মনে ভাবল  কি হল? ব্যাপারটা?
কেনই বা বাবাইদা ডেকেছিল? কথাগুলো কেনই বা জিজ্ঞাসা করেছিল হাজারটা প্রশ্ন তার মনের মধ্যে ঘুরতে শুরু করলো।
হঠাৎ দু তিন পর বাড়িতে বাবাই দার মা বাবা এল। মিঠাই তখন ক্রিকেটের প্র্যাকটিসে। বাড়িতে ফিরে শোনে তার বিয়ের ভালো একটা প্রস্তাব এসেছে। শুনেই নারাজ করে দেয় সে প্রস্তাব। 
পরে যা শুনল তখন তার সবকিছুকে অবিশ্বাস্য মনে হল। বাবাই দার মা-বাবা এসেছিল। তাদের একমাত্র ছেলের জন্য মিঠাইকে চাইতে।

মিঠাই কখোনো ভাবেনি যে তার ক্রাশের সাথে তার বিয়ের সম্বন্ধ আসবে । মিঠাই ভীষণ খুশি হয়ে যায়। মনের ভিতর কাজ করতে থাকে অজানা একটা ভালো লাগা। যে ছেলেটাকে ছোট থেকে তার ভীষণ ভালো লাগতো, কিন্তু বলে উঠতে পারিনি কিছুতেই। ভাবতেও পারিনি যে বলে উঠতে পারবে কোনদিনও কিছু। তার সাথে আগামী মাসে তার বিয়ে।

ধুমধাম করে মিঠাই আর বাবাইয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়। মিঠাই তার ছোটবেলার ক্রাশকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেয়ে আজ ভীষণ সুখী। 

কেটে গেছে অনেকগুলো বছর এখন মিঠাই বাবাই আর তাদের একটি মাত্র ছেলে বুম্বাকে নিয়ে তাদের ভীষন সুখী সংসার ।


মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ