যুক্তি দিয়ে পুরাণ ও মহাকাব্য চর্চা - প্রথম পর্ব /প্রবীর দে
দিবি আরোহণ
কাল গণনা
করা এবং প্রামাণ্য দিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়াই সমস্যা। তাই পুরাণ হল মাইথোলজি, ইতিহাস নয়। তবে
পুরাণ কে অস্বীকার করা যায় না। ভারতীয় সংস্কৃতিতে বেদের
গুরুত্ব অপরিসীম আর পুরাণকে ছাড়া বেদ
সম্পূর্ণ নয়। তাই আলোচ্য বিষয়ে আসার আগে মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে বিশ্বব্যাপী ,কালবিন্দু হিসেবে বিবেচিত
হয়েছিল কেন খ্রীষ্ট জন্মকাল ।কেন কৃষ্ণ জন্মকালকে নেওয়া হল না ?
মানছি , কৃষ্ণজন্মকালকেও পন্ডিতরা
খ্রীষ্টপূর্বাব্দে ভাবতে আপত্তি জানিয়েছেন। কারন আছে হয়ত।
কিন্তু সমস্যাটা অন্যজায়গায়,পুরাণ যুগমানের দ্বারা তার কাল নির্ণয় করেছেন। তাই পুরাণে কোন বি-- সি/এ-ডি নেই। রামের জন্ম খ্রীষ্ট পূর্ব হিসাবে বলতে গেলে বলবো
দুই হাজার একশো চব্বিশ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দে। এবার আমি যদি
রামাব্দ ধরে এগোই তাহলে ধরতে হবে চার হাজার একশো সাল।আর কৃষ্ণেরটা তাহলে কি
বলবো? রামের থেকে কৃষ্ণ ছিলেন ছয়শো ছেষট্টি বছরের ছোট।আমি সংশয়ী,যু ক্তি খুঁজে
বেড়াই ....তাই এত বিপদ!
যাক বাবা এত জটিলতায় গিয়ে লাভ নেই। ব্যাপকভাবে সামাজিক হতে হলে কারো না কারো মত ,শাসন মেনে নিতেও হয়। পুরাণ অনুযায়ী ----,সৃষ্টি,প্রলয়,বংশ,মন্বন্তর,বংশানুচরিত এই পাঁচ বিষয় হল ইতিহাসের উপাদান। পুরাণ অনেক আগে রচিত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু কালবিন্দু তৈড়ি করতে পারে নি। এটাই ট্রাজেডি। সব কিছু তুমি অনেক আগেই বলে যেতেই পারো, কিন্তু, যে দেশ সবার আগে নিজেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত করতে পেরেছে, সে দেশ বা গোষ্ঠী তারা নিজেদের মত অনুযায়ী কালবিন্দুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। তাই কত প্রাচীন সেই মনুকালের হিসেবে করতে হলেও সেই খ্রীষ্ট কালবিন্দুর সাহায্য নিতে হয় .....। তাই তো মনুকালের শুরু বলতে গিয়ে বলি --- পাঁচ হাজার নয়শো আটান্ন খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ। মনে রাখতে হবে , পুরাণকালে কাল গননার জন্য যুগকাল ও মনুকাল ধরা হত কিন্তু পুরাণের লেখকরা কিছু কথা এমনভাবে বলেছেন ,হয়ত তার সঠিক মানে উদ্ধার সম্ভব হয় নি, ,রূপক অর্থে ডিকোড করতে পারে নি হয়ত ....তাই তার কালবর্ণনা মানতে অসুবিধা।
ধরো আমি বললাম রাম পনেরো
বছর বয়সে সীতাকে বিয়ে করেন,সাতাশ বছর বয়সে বনে গেলেন,বিয়াল্লিশ বছর বয়সে
অযোদ্ধায় ফিরে এলেন , আবার রাজা হলেন। এই অব্দি ঠিকঠাক, কিন্তু এরপর পুরাণ লিখে দিল 'রাম একাদশ সহস্র বছর রাজত্ব
করে স্বর্গে চলে যান। ব্যাস! এখানেই গন্ডোগোল!
আমার মনে হয় আমরা যেমন নেতাদের প্রশস্তি করতে গিয়ে বলে থাকি..."অমুক দাদা/দিদি
যুগ যুগ জিও"......পুরাণকার হয়ত প্রশস্তিসূচক বাক্য সংখ্যাদ্বারা
প্রকাশ করতে গিয়ে সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছিলেন। এখানেই কেলো হয়ে গেল।
পুরাণকে জানার ব্যাপারে অনেকের ই অনাসক্তি আছে। আজ সেই
পুরাণ থেকে কিছু কথা শোনাবো যা
শুনলে কুসংস্কার ঘুচবে,সত্যকে জানা যাবে পুরাতনকে বিস্মিত শ্রদ্ধায় প্রনাম জানাতে
ইচ্ছে করবে।
দিবি আরোহণ হল জ্ঞান।মানুষের কর্মযোগে দেবত্ব লাভের পথ হল 'দিবি আরোহণ'।
উত্তম মানুষ প্রতিলোম ক্রিয়ার আশ্চর্য সূত্র অনুযায়ী , প্রথমে মানুষ রূপেই পূজিত হন,তারপরে
তিনি দেবতা হন ,তারপরে জ্যোতিষ্ক রূপে তাঁকে কল্পনা করা হয়।
দিবি আরোহণের সূত্র অনুযায়ী, 'ইন্দ্র
একাধিক ,সকল ইন্দ্র ই প্রথমে মানুষ ছিলেন, পরে দেবতা ,তারপর জ্যোতিষ্ক(সূর্য)।এই সূত্র না মানলে
ঋকবেদের ইন্দ্র বিষয়ক সব সূক্তোগুলির অর্থ বোঝা যায় না।
কৃষ্ণ মানুষ,কৃষ্ণ নারায়ণ,কৃষ্ণ ই সূর্য। ধ্রুব মানুষ , আবার ধ্রুব জ্যোতিষ্ক।
সুক্তো গুলি যিনি জ্ঞান ও বুদ্ধি দ্বারা সুক্ষভাবে পাঠ করেন ,তিনি দেবতার
মনুষ্যত্ব নির্ণয় করতে সক্ষম।
প্রথম প্রশ্ন ,দেবতা কারা?
মনু বলে গেছেন , মনুবংশীয় মানুষ
ছাড়াও আরও যে বিভিন্ন জাতি রয়েছেন
, তাঁরা হলেন --দেবতা,অসুর গন্ধর্ব,সর্প,নাগ, সিদ্ধ ,যক্ষ,রক্ষ।অসুরেরা ছিলেন দেবতাদের
জ্ঞাতি ও বন্ধু। অসুরদের সৃষ্টি হবার আগে ,তারপরে দেবতা ও অন্যান্য
রা।
পুরাণে বিভিন্ন ইন্দ্রের কথা বলা আছে। বিরাট বীর পুরন্দর ইন্দ্রের নামে র উল্লেখ পাওয়া যায় পুরাণে । পুরাণ বিশেষজ্ঞ কিছু পন্ডিতদের মত
অনুযায়ী দেবতারাও মানুষ ছিলেন। মানুষ ই দেবতা হয় ।ঋকবেদ সংহিতার অনুবাদক শ্রী রমেশ চন্দ্র দত্তের মতও তাই। তাই
নবদ্বীপের নিমাই মিশ্র নিজ মহিমায় ভগবান।গদাধর চক্রবর্তী তাই রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব
ভগবান। বিবেকানন্দ,রবীন্দ্রনাথ , নজরুল , নেতাজি সুভাষচন্দ্রও সেই
অর্থে মানুষের কাছে দেবতা-ই।

0 মন্তব্যসমূহ