মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা

বিশ্ব বঙ্গীয় সাহিত্য কলা আকাদেমি অধিভুক্ত পত্রিকা

জীবনানন্দ দাশের বোধ কবিতায় আলোকিত হওয়া / অলিপা বসু





        অলিপা বসু









জীবনানন্দ দাশের বোধ কবিতায় আলোকিত হওয়া /  অলিপা বসু

'মহাপৃথিবী' সংকলনের সুবিখ্যাত কবিতা 'আট বছর আগের একদিন' কবিতার পূর্বসূরী বলা চলে এই কবিতাটিকে ৷ যে বোধ-এ 'বোধ' কবিতার নায়ক আক্রান্ত, সেই একই বোধ-এর সমস্যার সমাধান করতে না পেরে 'আট বছর আগের একদিন' কবিতার আত্মহত্যাকারী মানুষটি আত্মহত্যা করেছিল আর ঐ সমস্যার উপযুক্ত মীমাংসা করতে পেরে কবি ঐ কবিতায় একটি বলিষ্ঠ জীবন প্রত্যয়ে উত্তীর্ণ হয়ে ছিলেন ৷
আবার 'বনলতা সেন' কবিতার নায়ক যে দেশ দেশান্তরে বিস্তৃত ইতিহাস ও প্রকৃতির মধ্যে ভ্রমণ করে  হঠাৎই বলেছিলেন ' আমি ক্লান্ত প্রাণ এক; চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন'—এই ক্লান্তির কারণও ঐ বোধ ৷

'আট বছর আগের একদিন' কবিতায় জীবজগতের সঙ্গে তুলনা করে মানুষকে তার বুদ্ধিভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্বের মহিমায় দেখিয়েছেন ('যে জীবন শালিখের—দয়েলের মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা '),কিন্তু
 এই কবিতায় কবি লক্ষ্য করেছিলেন মানব সমাজেই মানুষের সঙ্গে মানুষের পার্থক্য রয়েছে ৷ 

১) যারা এই 'বোধে' আক্রান্ত ৷
২) যারা এই বোধে আক্রান্ত হয় না ৷ কবির ভাষায় যারা 'সহজ লোক' 

"সহজ লোকের মতো কে চলিতে পারে!
কে থামিতে পারে এই আলোয় আঁধারে
সহজ লোকের মতো;তাদের মতন ভাষা কথা
কে বলিতে পারে আর;কোনো নিশ্চয়তা
কে জানিতে পারে আর?"

যারা এই পৃথিবীতে এসে পৃথিবীকে সন্তান দান ছাড়া আর কিছুই করেনি বা করছে না,তাদের সঙ্গে ঐ 'বোধ' সম্পন্ন মানুষের পার্থক্য রয়েছে ৷ কবিতার পঞ্চম স্তবকটিতে সকল সহজ লোকের সঙ্গে ঐ বোধ সম্পন্ন মানুষ তথা কবির পার্থক্যটি monologue এর ঢঙে ব্যক্ত হয়েছে ৷

"সকল লোকের মাঝে ব'সে
আমার নিজের মুদ্রা দোষে
আমি একা হতেছি আলাদা?
আমার চোখেই শুধু ধাঁধা ?
আমার পথেই শুধু বাধা?"

ঐ বোধ মানুষের গভীর জিজ্ঞাসার ফসল ৷ যার ঐ জিজ্ঞাসা নেই সে সহজ জীবন অতিবাহিত করে যায়৷ অনেক যন্ত্রণার হাত থেকে তার সহজ অব্যাহতি ৷এরাই জীবনের সমুদ্রকে সফেন করে উপভোগ কর ৷
'বনলতা সেন' কবিতার নায়ক ঐ বোধ ভারে ক্লান্ত হয়ে দেখেছিল চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন ৷ চিন্তাশীল মানুষ ঐ সফেন জীবনোপভোগের শরিক নয় ৷ চিন্তাশক্তি থাকার জন্যই অন্য মানুষের সঙ্গে তার পার্থক্য ৷ ঐ চিন্তাশীলতার জন্যই অন্যান্য "সহজ লোকের" চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ ৷ আবার ঐ চিন্তাশীলতার জন্যই সে অহরহ অন্তর যাতনা ভোগ করে চলেছে ৷ সহজ লোকের মত নির্ভেজাল আনন্দকে আর সে পেতে পারে না,তখন সে আনন্দকে প্রত্যাশা করে চিন্তাশীলতার মধ্যেই, চিন্তন বিষয়ের আবিষ্কারে ৷তখন চাষবাস,জলতোলা,ফসল কাটা,মাছধরা ইত্যাদি প্রাত্যহিক কাজের মধ্যে নিমগ্নতা আসে না,এই যাবতীয় কাজ তখন তুচ্ছ হয়ে পণ্ড মনে হয় ৷আলো অন্ধকারে যেখানেই যাওয়া যাক তার হাত এড়ানো যায় না, প্রার্থনার সময়কেও সে শূন্য করে ফেলে ৷ স্বপ্নরচনা তখন অসম্ভব ৷ ভালবাসায় তখন শান্তি মেলে না৷ লক্ষণীয় এই কবিতায় কবি ভালবাসাকে বললেন " ধুলো আর কাদা" অর্থাৎ অর্থহীন , অথচ 'বনলতা সেন' কবিতার নায়ক ঐ বোধএ ভারাক্রান্ত হয়ে 'বনলতা সেন' এর শান্তির আশ্রয় পেয়েছিলেন ৷ঐ প্রেমের শুশ্রূষায় নতুন কর্মোদ্যম ফিরে পেয়েছিলেন ৷ তাহলে কি কবিতা দুটির মধ্যে কবির মতান্তর ঘটেছে !—বস্তুতঃ মতান্তর ঘটেনি, আসলে বনলতা সেনের প্রেম আর এই কবিতার মেয়ে মানুষের ভালবাসার মধ্যে প্রেমের চরিত্রগত পার্থক্য রয়েছে ৷বনলতা সেনের প্রেম সৃজনশীল, তা প্রেমের আদর্শয়িত রূপ, কিন্তু এই কবিতার মেয়েমানুষের ভালবাসা নিতান্ত স্থূল জাগতিক ৷বাস্তবের রূঢ়জগতে যে ভালবাসার জন্য একদা মানুষ অসাধ্য সাধনা করে, দৈনন্দিন ব্যবহারে সেই প্রেমের ভূমিকার পরিবর্তন ঘটে ৷ বাস্তবের স্থূল জগতে ভালবাসার গতি প্রকৃতি বর্ণনা করে কবি লিখেছেন:—
"আমারে সে ভালোবাসিয়াছে,
আসিয়াছে কাছে,
উপেক্ষা সে করেছে আমারে,
ঘৃণা করে চলে গেছে—যখন ডেকেছি বারে-বারে
ভালোবেসে তারে";

সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনে স্বার্থ দ্বন্দ্বে প্রেম আন্দোলিত ৷ তাই সেখানে কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে উপেক্ষা বা ঘৃণা করে দূরে চলে যাওয়াও বর্তমান ৷'বনলতা সেন'এর প্রেমে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই,ঘৃণা,উপেক্ষা নেই, সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন আছে ৷ এই আত্মনিবেদন দয়িতকে সৃজনীকর্মে সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ উদ্দীপিত করার জন্য ৷
স্বপ্ন প্রেম অর্থ কীর্তি কিছুই ঐ বোধের হাত থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না,জোর করেও ঐ বোধের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না ("মড়ার খুলির মতো ধ'রে/আছাড় মারিতে চাই,জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে/তবু সে মাথার চারি পাশে") ৷
এই "বোধ"কে এই কবিতায় কবি গলগন্ত মাংসে সৃষ্ট কুঁজ, নষ্ট শসা পচা চালকুমড়ার ইমেজে প্রকাশ করেছেন ৷'আট বছর আগের একদিন' কবিতায় ঐ বোধ উটের গ্রীবার মত কোনো এক নিস্তব্ধতার সৃষ্টি করে আত্মহত্যার পথে প্ররোচিত করেছিল আত্মহত্যাকারী মানুষটিকে ৷ এই কবিতায় কবি ইতিহাস এবং প্রকৃতিচেতনায় সমৃদ্ধ বৃদ্ধ পেঁচার কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন ঐ সংকটের সম্মুখবর্তী হওয়ার মন্ত্র সম্পর্কে ৷বর্তমান কবিতার বোধের আলো আঁধার,সদা অনিশ্চয়তা, অবিরত আক্রমণ ৷'আট বছর আগের একদিন ' কবিতার 'বিপন্ন বিস্ময়' এর সামনে দাঁড়িয়ে কবি একটি সদর্থক জীবনবাদী প্রত্যয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন ৷

বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত পৃথিবীতে মানবজীবনে যে সর্বব্যাপী ওলট-পালট হয়েছিল—যার ফলে পুরোনো মূল্যবোধ গুলো ভেঙে গেল অথচ যখন নতুন মূল্যবোধ খুঁজে পাওয়া গেল না তখন মানবপ্রগতির ধারাকে নিশ্চিত পথে প্রতিষ্ঠিত করতে জীবনের নানা ক্ষেত্রে নানাস্তরে যে চিন্তানায়কেরাই সচেষ্ট হয়েছেন তাঁদেরকেই এই বোধের দ্বারা আক্রান্ত হতে হয়ছে ৷ এ হ'ল জীবনের আভ্যন্তরীণ বাস্তব সমস্যা ৷ জীবনানন্দ আভ্যন্তরীন সেই বাস্তব সমস্যায় কতখানি চিন্তিত হয়েছিলেন এবং কত নিখাদ ভাবে সেই সমস্যাকে সনাক্ত করতে পেরে ছিলেন "বোধ" কবিতাটি তারই এক উল্লেখ্য প্রমাণ ৷






মেঘদূত সাহিত্য পত্রিকা একটি প্রয়াস

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ