সঙ্গীত স্রষ্টা দ্বিজুবাবু
তাঁর কথা বলতে গেলে কোন বিষয়টি আগে উল্লেখ করব সেটাই গভীর চিন্তার বিষয়। বাবা নামকরা রাজার (কৃষ্ণনগরের) দেওয়ান ,মা বিখ্যাত বৈষ্ণব দার্শনিক অদ্বৈত আচার্যের বংশধর ,ছোট বেলা থেকেই পড়াশুনায় কৃতি ছাত্র , প্রেসিডেন্সি থেকে স্নাতকোত্তর শেষে বিলেত থেকে কৃষিবিদ্যার বিশেষজ্ঞ হয়ে দেশে ফিরে এসে ব্রিটিশ ভারতের যোগ্য সরকারি পদস্থ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন ... এসব কথা সবই আপনারা জানেন ...। যদিও এসব কথা এখনও আমরা জানার বা মনে রাখার চেষ্টা করতাম না ... যদি তিনি কবি হিসেবে,নাট্যকার হিসেবে, সঙ্গীত স্রষ্টা হিসেবে এক অসাধারণ কীর্তি স্থাপন না করতেন। হ্যাঁ , আমি বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীত জগতের অন্যতম মহাপুরুষ ,পঞ্চ কবির অন্যতম , বিখ্যাত নাট্যকার , দেশপ্রেমী দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কথা বলছি ...
আজ কিন্তু কবি হিসেবে ডি এল রায় নন,নাট্যকার ডি এল রায় নন , আজ শুধু সঙ্গীতজ্ঞ ডি এল রায়ের স্মৃতিচারণ করব । আজ তাঁর গান নিয়েই আলোচনা করব । আসলে কি সংগীতস্রষ্টা দ্বিজেনলালের অনন্য সাধারণ কালজয়ী সংগীত ঘরানা তাঁর বিশাল নাট্যপ্রতিভার থেকেও অধিকতর সমুজ্জ্বল, কেন জানিনা আমার এরকমই মনে হয় ।
সাহিত্য ও সঙ্গীতের পরিবেশ তো সেই শুরু থেকেই
ছেলেবেলা থেকেই এক সাঙ্গীতিক পরিবেশে প্রতিপালিত হন দ্বিজেন্দ্রলাল; যা তার পরবর্তী সঙ্গীত জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বাবা কার্তিকেয়চন্দ্র নিজে ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিশিষ্ট টপ-খেয়াল গায়ক।এছাড়া কার্তিকেয়চন্দ্র নিজে ছিলেন একজন সুপণ্ডিত, সাহিত্যিক এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী। তিনি ইংরেজি, সংস্কৃত ও পার্সি ভাষায় যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। লিখেছিলেন কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের ইতিহাস। কার্তিকেয়চন্দ্র আত্মজীবনীও লিখেছিলেন। ‘গীতমঞ্জরী’ কাব্যগ্রন্থ রচনাও তাঁর অসামান্য এক কীর্তি।তৎকালীন বঙ্গদেশের বিশিষ্ট ও খ্যাতনামা মানুষ— বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখের সঙ্গেও ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ।
১৮৬৩ সালের ১৯ শে জুলাই কৃষ্ণনগরে তাঁর জন্মের পর থেকেই দ্বিজেন্দ্রলাল যে সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বড় হয়েছেন ,সেখানে কবিতা লেখা বা গানের চর্চা করা... এগুলো এড়িয়ে যাবার উপায় ছিল না । এইরকম পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা দ্বিজেন্দ্রলালের মাত্র ১৯ বছর বয়সে ‘আর্যগাথা’ নামের একটি গানের বই প্রকাশ করেন ।১০৮ টি গান নিয়ে তাঁর এই গীত সংকলন প্রকাশিত হয় ( প্রথম ভাগ) ১৮৮২ তে । দ্বিতীয় ভাগ বের করেন ১৮৯৪ সালে । আরও একটা অবাক হবার বিষয় উল্লেখ করি ... মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই উনি হারমনিয়াম বাজিয়ে গাইতে পারতেন এবং সাত বছর বয়স থেকে রীতিমতো অনুষ্ঠানে গান গাওয়া আরম্ভ করলেন । কিশোর বয়সের তাঁর এই গানগুলিতে বিষয় হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছিল - প্রকৃতির মনোরম সৌন্দর্য ,লাবন্য; জগতের শোক- জড়া জাত দুঃখ ; ঈশ্বর ভক্তি ও স্বদেশ প্রেম।এই পর্বে তাঁর লেখা একটা গানের দু কলি শোনালে বুঝতে পারা যাবে ...
" গগনভূষণ তুমি জনগন মনোহারী
কোথা যাও নিশানাথ ,হে নীল
নভবিহারী “?
হেসে হেসে, ভেসে ভেসে
চ’লে যাও কোন দেশে,।
হুগলি কলেজ থেকে
দ্বিজেন্দ্রলাল বিএ এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাশ
করলেন । কিছু দিন ছাপড়ায় ‘রাভেলগঞ্জ মুখার্জী সেমিনারি’তে শিক্ষকতা করার পর
সরকারি বৃত্তি পেয়ে ইংল্যান্ডে গিয়ে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনো শুরু করেন।
‘রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কলেজ’ এবং ‘রয়্যাল এগ্রিকালচারাল সোসাইটি’ থেকে
কৃষিবিদ্যায় ‘এফআরএএস’ এবং ‘এমআরএসি’ ও ‘এমআরএএস’ ডিগ্রি নিয়ে তিনি দেশে ফিরে
এলেন ১৮৮৬ সালে। দেশে ফিরে এসে সরকারী চাকরি গ্রহন করলেন। জরিপ ও কর মুল্যায়ন
বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন। মধ্যপ্রদেশে সরকারী অফিসে বদলী হলেন ...
ফিরে এলেন ,দিনাজপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে,এরপর ১৮৯০ তে বর্ধমানের সেটলমেন্ট অফিসার ....বিভিন্ন
দায়িত্বপূর্ণও পদে কাজ করতে লাগলেন ...। কিন্তু কবিতা আর সঙ্গীতকে তিনি এক মুহূর্তের জন্য কাছ
ছাড়া করেন নি। জীবন ও জীবিকার সাথে সাংস্কৃতিক সৃষ্টিকে তিনি
বরণ করে নিলেন পরম সাধনায়।
প্রবর্তিত হল বাংলা গানের
নতুন এক ধারা- দ্বিজেন্দ্র গীতি
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের
ধ্রুপদ ও খেয়াল শাখা দুটি তাকে খুব গভীরভাবে প্রভাবিত করত আর ইংল্যান্ডে থাকাকালীন
তিনি শিখলেন পাশ্চাত্যসঙ্গীত ।দেশে ফিরে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের শৈলী বাংলা গানে
প্রয়োগ করেছিলেন চমৎকার ভাবে। অনুবাদ করেছেন বহু ইংরেজি ও
আইরিশ গান। তবে পাশ্চাত্য সুরেই শুধু আটকে থাকেননি। ঢপ-খেয়াল, বাউল-কীর্তনের
সুর-তাল প্রয়োগ করেছেন সুচারু ভাবে। কাব্যসঙ্গীতে প্রাচ্য সুরের সঙ্গে পাশ্চাত্য
রীতি হাল্কা ভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন তিনি নিপুণ ভাবে।
১৮৮৬ তে বাবা মারা গেলেন। সে
বছরই প্রকাশিত হল LYRICS OF INDIA (POEMS).। বিলেত থেকে ফিরে এসে আর্যগাথা দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশ করলেন । এই পর্যায়ে যে বাংলা গানগুলো তৈরি হল তা কিন্তু স্কচ,,আইরিশ ও
ইংরাজি ভাষার গান ভেঙ্গে । আর এবার গানের বিষয়বস্তু হিসেবে পাওয়া গেল প্রধানত প্রেম এছাড়া
,হাসি,ব্যঙ্গ,দেশাত্মবোধ ,ভক্তি প্রভৃতি বিষয়ও ছিল ।
১৮৮৭-তে বিয়ে করলেন এবং ১৮৮৮-র জানুয়ারিতে মুঙ্গেরে বদলি হলেন । এই দুটি ঘটনা তাঁর সঙ্গীত জীবনেরও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই দুটি ঘটনা তাঁর জীবনে যে-পরিবর্তন নিয়ে এলো তা তাঁর সংগীতজীবনকে নতুন এক দিকনির্দেশনার সন্ধান দিলো। সুখী দাম্পত্য জীবনের মাধুর্য এবং প্রেমের সূক্ষ্ম বোধের উদ্বোধন মুঙ্গেরে এসেই হল। দাম্পত্য প্রেমের উষ্ণতায় ভরা দিনগুলি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এমন সব গান রচনায়, যা পরবর্তীকালে কাব্যসংগীতের ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ হয়ে আ ছে।আর এখানে এসে দেখা হল ভাগলপুরের প্রসিদ্ধ টপ-খেয়াল গায়ক সুরেন্দ্রনাথ মজুমদারের সাথে। তিনি ছিলেন পারিবারিক বন্ধু ও আত্মীয়। শুরু হল সুরেন্দ্রনাথ মজুমদারের কাছে তাঁর ভারতীয় মার্গ সংগীতের শিক্ষাগ্রহণ।সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার তাঁকে ভারতীয় সংগীতের বিশুদ্ধতা এবং গভীর অন্তর্মুখী চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলা গানে নিজের গায়কি এবং ঘরানা বেছে নিতে সুরেন্দ্রনাথই তাঁকে পথ দেখিয়ে দেন। সুরেন্দ্রনাথের সান্নিধ্যে এসে দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর গানে রাগের মিশ্রণ ঘটালেন গায়নপদ্ধতিতে নমনীয়তার সঙ্গে দৃঢ়তার সহজ এবং সুন্দর সমন্বয় ঘটালেন। পরিনত হলেন মার্গ সঙ্গীতের এক বিশিষ্ট গায়কে । বাংলা কাব্য সঙ্গীতের ও আধুনিক গানের এক সার্থক রুপকার হিসেবে নবজন্ম হোল তাঁর।
প্রথম দিকে দ্বিজেন্দ্রলালের গান দ্বিজুবাবুর গান নামে
পরিচিত ছিল পরে তা দ্বিজেন্দ্র গীতি হয়। মাত্র পঞ্চাশ বছরের জীবন
(১৮৬৩–১৯১৩) । রচিত গানের সংখ্যা প্রায় ৫০০ , স্বরলিপি বদ্ধ গানের সংখ্যা মাত্র
১৩২। ভাবা যায় ! কিন্তু কেন? উত্তর হল -তাঁর স্বভাবগত উদাসীনতা। গান বেঁধেছেন, গেয়ে আনন্দ পেয়েছেন, বহু
শ্রোতাকে আনন্দ দিয়েছেন, কখনো ভাবেননি সে-গান সংরক্ষণের কথা। মৃত্যুর এগারো বছর
পরে তাঁর গানের প্রথম স্বরলিপি বই বেরোয় (বইটির নাম দ্বিজেন্দ্রগীতি প্রথম খন্ড।
সম্পাদনা করেছিলেন তাঁর সুযোগ্য পুত্র দিলীপকুমার রায় ) ।
দ্বিজেন্দ্রলালের সংগীতজীবন
বিভাজিত করা যায় কয়েকটি পর্বে। প্রথম হাসির গান, সমাজ ও সমসাময়িক জীবনকে
তির্যকভাবে দেখাতে গিয়ে রচনা করেছেন হাসির গান। দ্বিতীয় পর্বে
ব্যক্তিজীবনের গভীর আবেগ আর উচ্ছল প্রেমের আত্মমগ্নতায় সৃষ্টি হয়েছে প্রেমের গান।
তৃতীয়ত, তাঁর স্বদেশি গান। স্বদেশি গানের উৎস ছিল বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন। এরপর তাঁর গান
রচনার চতুর্থ পর্বে রঙ্গমঞ্চকে ঘিরে রচিত হয়েছে নাটকের গান। সবশেষে পঞ্চম পর্বে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষটি
জীবনের শেষ আশ্রয় হিসেবে ভক্তি-রসাশ্রিত গানের আশ্রয় বেছে নেন।
হাসির গান
সংগীত সৃষ্টির প্রথম পর্ব
শুরু হয় হাসির গানের ফুলঝুরি ছড়িয়ে। বাঙালি শ্রোতার কাছে তিনি হাসির গানের রাজা
হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর হাসির গান শুধু বিনোদন কিংবা স্ফূর্তির জন্য ছিল না, সে-গানে
ছিল কৌতুক, বিদ্রূপ এবং বুদ্ধিগ্রাহ্য বাক্-চাতুর্য ভরা । গানের মধ্যে দিয়ে
হাস্যরস পরিবেশনের জন্য যে প্রবল সমাজচেতনা, সূক্ষ্ম বাস্তবদৃষ্টি এবং নিপুণ
ভাষাবিন্যাস প্রয়োজন, তার সবই তাঁর হাসির গানে ছিল। একটি গানের কিছু অংশ উপস্থাপন
করলে বোঝা যাবে তার নমুনা …।
“দেখ হতে পারতাম নিশ্চয় আমি মস্ত একটা বীর
কিন্তু গোলাগুলির গোলে কেমন
মাথা রয় না স্থির;”।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর হাসির
গানের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন । খামখেয়ালি সভায় বসে দ্বিজুবাবু যখন গাইতেন তখন তাঁর সাথে
গলা মেলাতেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং এবং অতুল প্রসাদ সেন ।হাসির গানগুলিতে তিনি ইংরেজি,
স্কটিশ ইত্যাদি গানের সুর সংযোজিত করেন। রঙ্গব্যঙ্গ বা বিদ্রুপাত্মক হওয়ায় এই
গানগুলি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং আর এটাও ঠিক যে বাংলা সঙ্গীতের হাসির গানের
সম্ভারে দ্বিজেন্দ্রলালের অবদানই সর্বাধিক। সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত
দ্বিজেন্দ্রলাল রচনা করেছিলেন অপূর্ব সব ব্যঙ্গরসাত্মক
গান। স্বার্থপর রাজনীতিবিদ এবং তথাকথিত দেশভক্তদের উদ্দেশ্য করে রচিত এমন একটি অসাধারণ ব্যঙ্গরসাত্মক
গানের কথা উল্লেখ করব --- ‘নন্দলাল’। গানটির মধ্য দিয়ে তিনি দেশসেবার নামে
স্বার্থপরতার স্বরূপ তুলে ধরে তীব্র বিদ্রূপবাণ নিক্ষেপ করেন । নতুন প্রজন্মের জন্য এই গান শোনার জন্য আমন্ত্রণ রইল ।
একসময় বিলেত-যাওয়ার জন্য তাঁকে
হিন্দু সমাজ একঘরে করেছিলেন । সমাজপতিদের বিধান মান্য করে তিনি তথাকথিত
প্রায়শ্চিত্ত করেননি। কবি স্বাধীনচিত্ত পরিহাসপ্রিয় হয়ে রচনা করেছিলেন একঘরে
(১৮৯৭) প্রহসন। যেখানে উনি লিখছেন ...
“বিলেত থেকে ফিরে এসে হরিদাস
রায়
ছেড়ে দিলেন মুরগী, গরু জাতের
ঠেলায়
মুড়িয়ে মাথা, ঢেলে ঘোল
ধল্লেন আবার মাছের ঝোল”।
তবে কি ,হাসির গানের
স্ফূর্তি তাৎক্ষণিক, ফুরিয়ে যায় সহজে। এ-গানের স্রষ্টাকে গভীরভাবে কেউই বুঝতে
চাইতো না। হাসির গানের জনপ্রিয়তা সংগীতকার হিসেবে ভালোর চেয়ে তাঁর ক্ষতিই বেশি
করেছিল। হাসির গান দিয়ে তিনি যে শুরু করেছিলেন এবং জনপ্রিয় হয়েছিলেন সেটা তাঁর
জন্য ক্ষতিকর হয়েছিল। এ-গান তাঁকে লঘু গানের রচয়িতার দুর্নাম এনে দিয়েছিল।
হাসির গানের অনবদ্য স্রষ্টা
হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলালের নাম সংগীত-ইতিহাসে অম্লান থাকলেও সে-ধারাটিকে বহমান রাখা
কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। এ-গানের জন্য যে বলিষ্ঠ কণ্ঠ, গায়কি, সুরবিন্যাস,
স্বরপ্রক্ষেপণে দক্ষতার প্রয়োজন, সাধারণ শিল্পীর পক্ষে তা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়।
তাঁর গানে বিদেশি সুরের প্রয়োগ অনুধাবন করাও সকলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাঁর হাসির
গান যে হারিয়ে গেল তার কারণ এ-গান গাইবার মতো উপযুক্ত শিল্পী পরবর্তীকালে আর তৈরি
হয়নি।
প্রেমের গান
হাসির গান থেকে কাব্যসংগীত , মূলত প্রেমের গানে উত্তরণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দ্বিজেন্দ্রলালের ব্যক্তিজীবনের বিশেষ ঘটনা। ১৮৮৭তে হোমিয়োপ্যাথি চিকিৎসক প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের মেয়ে সুরবালা দেবীকে বিয়ে করলেন । দাম্পত্যজীবন দ্বিজেন্দ্রলালকে প্রেমের গানের দ্বিজেন্দ্রলাল বানিয়ে তুলল। ষোলো বছরের দাম্পত্যে খুব বেশি গান যে লিখলেন প্রেমের, তা নয়। কিন্তু যা রচনা করলেন, তাতে গানের বিধাতা যেন নিজের হাতে স্বাক্ষর রেখে গেলেন।
এই সময় তিনি বহু গান লিখলেন
ব্যক্তিগত অনুভূতির তুচ্ছ উপলক্ষ থেকে। কয়েকটি গানের দু এক কলি যদি উল্লেখ করি তাহলে বুঝতে
পারবেন …।
১। “এসো এসো বঁধু বাঁধি
বাহুডোরে, এসো বুকে ক’রে রাখি।
বুকে ধরে মোর আধ ঘুম ঘোরে
সুখে ভোর হ’য়ে থাকি “।
২ ।
আজ যেন রে প্রাণের মতন
কাহারে বেসেছি ভালো
উঠেছে আজ মলয় বাতাস
ফুটেছে আজ মধুর আলো ।
৩। ‘তোমারেই ভালবেসেছি আমি
তোমারেই ভালবাসিব।
তোমারই দুঃখে কাঁদিব সখে
তোমারই সুখে হাসিব’ ।
তোমারই সুখে হাসিব’ ।
কত আর উল্লেখ করব এই
স্বল্পপরিসরে ।তাঁর গান প্রসঙ্গে দিলীপকুমার রায় বলেছিলেন – তাঁর মধ্যে আছে সুরের
আগুন আর গানের গোলাপ। গান গোলাপ হয়ে ফুটে উঠেছে তাঁর প্রেমের গানে। প্রেমের গানে
তাঁর প্রতিভা নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেয়েছিল। সুর ও বাণীর মিলনই শুধু নয়,
‘গানগুলির মধ্যে কবির প্রতিভা, ছান্দসিকের ছন্দকুশলতা ও প্রেমিকের আন্তরিকতার
ত্রিবেণীসঙ্গম হয়েছে।’ তাঁর অন্তর্মগ্ন প্রেম-ভাবনার গানগুলিতে বিষাদের সুরের ছোঁয়া মনে একরকম
মধুর কারুণ্যের সঞ্চার করে। এমনি একটি গানের কথা উল্লেখ
করতে খুব ইচ্ছে হল ...
আজি তোমার কাছে
ভাসিয়া যায় অন্তর আমার
আজি সহসা ঝরিল :
চোখে কেন বারিধার?
ষোলো বছরের বিবাহিত জীবন,
নিবিড় প্রেম আর আবেগের উচ্ছলতায় পরিপূর্ণ ছিল, প্রেমের গান রচনার যে-জোয়ার এসেছিল
তখন, স্ত্রী সুরবালা দেবীর মৃত্যুর পর তা স্তব্ধ হয়ে গেল। কেন যেন মনে হয় পরবর্তী
প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর নিজেরই চারিত্রিক
অসংগতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং ব্যক্তিজীবনের নৈরাশ্য। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় স্ত্রী বিয়োগের পর আর কখনও
তিনি প্রেমের গান কিম্বা হাসির গান লেখেন নি ।
দেশাত্মবোধক গান
স্ত্রী সুরবালার মৃত্যুর পর ১৯০৫ সালে বদলি হয়ে এলেন খুলনায়। বঙ্গভঙ্গের পর ফের দুই বাংলা এক করার দাবিতে সেখানে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলেন ডিএল রায়। আর এই সময়েই তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছিল প্রচুর দেশাত্মবোধক সঙ্গীত। সে গানগুলো আজও সমান ভাবে জনপ্রিয় বঙ্গবাসীর কাছে। আজও কোথা হতে ভেসে আসে যখন সেই গান ‘ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হতে’ কিংবা ‘আমরা এমনি এসে ভেসে যাই’ পথচলতি আমাদের দু’দন্ড দাঁড় করিয়ে দেয় সেই সব গানের কথা আর সুরমাধুর্য।
বাঙালির দেশাত্মবোধক গানের
ভান্ডারকে সম্ভবত সর্বাধিক ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছে দ্বিজেন্দ্রলালের গান ।১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গ বিরোধী
আন্দোলনকালে তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলি স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছিল ।
তাঁর নাটকেও তিনি দেশাত্মবোধক গানগুলির সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন । আমার মত অনুযায়ী দ্বিজেন্দ্রলাল যদি আর
একটিও সংগীত সৃষ্টি না করতেন, তাহলেও শুধুমাত্র ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ ও ‘ধন ধান্য
পুষ্প ভরা’ এই দুটি গানের সুবাদেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন ।
দেশ তাঁর কাছে কোনো ভৌগোলিক
পরিধি মাত্র ছিল না। তা হয়ে উঠেছিল সজীব মাতৃমূর্তি। দ্বিজেন্দ্রলালের গানে
দেশমাতৃকার ছবিটি উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট।দেশহিতৈষিতার ধারাটি চিরদিন তিনি সযত্নে অন্তরে লালন
করে এসেছেন । তাই লণ্ডন থেকে ফেরার পর হিন্দু সমাজ তাঁকে জাতিচ্যুত করতে চাইলে
দ্বিজেন্দ্রলালের মনে হয়েছিল এ-দেশের সমাজের লোকজন নানা অকাজে নিদারুণ শক্তিক্ষয়
আর সময়ের অপব্যয় করে চলেছে। দেশহিতৈষিকতার কারনে ইংরেজ সরকার অন্যায়ভাবে তাঁকে
চাকুরিতে শুধু বদলিই করে গেছেন কিন্তু তিনি নিজে কখনও আত্মসমর্পণ করেননি বিদেশীদের কাছে।
নাটকের গান
স্বভাবে নির্জনতাপ্রিয়,
প্রকৃতিপ্রেমী, নিঃসঙ্গ, একজন মানুষের জন্য সংগীত যে হবে তাঁর আত্মপ্রকাশের উৎস,
তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। স্ত্রীর মৃত্যুর পর কাব্য সঙ্গীত অর্থাৎ প্রেমের গান
লেখা থেকে সরে এসে মূলত নাটকে মন দিলেন। স্বদেশপ্রেম তো তাঁর ছিলই । স্বাদেশিকতার অনুপ্রেরণা
জোগাতে তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলো রচিত হয়েছিল। জীবনের শেষ দশ বছরের সমস্ত সৃষ্টিশীল
প্রয়াস কেন্দ্রীভূত হলো নাটক এবং নাটকের গানে। শুধু নাটকের প্রয়োজনেই তিনি অনেক
গান রচনা করেছেন। তাঁর গান নাটকে বেশি ব্যবহূত হওয়ায় সকলের নিকট তা খুব
সহজেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 'সমাজ বিভ্রাট' ও 'কল্কি অবতার', 'বিরহ', 'ত্র্যহস্পর্শ', 'পুনর্জন্ম' এসব
প্রহসন বা নক্শায়।সামাজিক অসঙ্গতিকে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় কশাঘাত করেছেন তিনি।
এই কশাঘাতের অন্তরালে ছিল
দেশের প্রতি তীব্র মমত্ববোধ।প্রতাপসিংহ (১৯০৫), দুর্গাদাস (১৯০৬), নূরজাহান
(১৯০৮), সোরাব রুস্তম (১৯০৮),মেবারপতন (১৯০৮), সাজাহান (১৯০৯), চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১)
এই নাটক গুলিতেও যে গান তিনি ব্যবহার করেছিলেন সেখানেও যেন উপস্থিতি শুধু
নাট্যকার ডি এল রায় নন ,সঙ্গীতজ্ঞ ডি এল রায়ও।
সাজাহান (১৯০৯) নাটকের
দ্বিতীয় অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য। স্থান মথুরায় ঔরংজীবের শিবির। রাত্রিতে দিলদার একাকী।
তারপর দিলদারের সঙ্গে ঔরংজীবের প্রস্থান। তখন মোরাদ নর্তকীদের উদ্দেশে বলে, ‘নাচো,
গাও।’ তখন একটি নৃত্যগীতের দৃশ্যের অবতারণা করেছেন নাট্যকার। গীতটা কি ছিল একবার
মনে করিয়ে দিই ...সেই বিখ্যাত গান
“আজি এসেছি – আজি এসেছি,
এসেছি বঁধু হে ...’
আর সাজাহান নাটকে তিনি ব্যবহার করলেন সেই
বিখ্যাত গান যা আজ কালজয়ী ----
ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই
বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক – সকল
দেশের সেরা; ।
ভক্তি - রসাশ্রিত গান ও রাগাশ্রয়ী গান
ভারতীয় রাগসঙ্গীতের
কাঠামোয় পাশ্চাত্য সঙ্গীতের চালের সমন্বয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল বাংলা গানে এক অভিনব
ধারার সূচনা করেন ।মাত্র পঞ্চাশ বছরের জীবনের শেষ দশ বছর তাঁর মধ্যে ছিল তীব্র
একাকীত্ব, হতাশা।ঈশ্বরের প্রতি বন্দনা ও নির্ভরতাই ছিল তাঁর তৈরি
ভক্তি রসাশ্রিত গানের উৎস। কোন নির্দিষ্ট রাগকে অবলম্বন করে রাগের সরাসরি প্রভাবকে
ছাপিয়ে কথা ও সুরের অপূর্ব সমন্বয়ে সঙ্গীতে ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারতেন তিনি । তাঁর কিছু গান উল্লেখ করছি
যেগুলো লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে কত ভিন্ন ধরনের রাগের
যথার্থ প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন উনি তাঁর গানে ।
ধনধান্যপুস্পে ভরা - কেদার রাগ
নীল আকাশের অসীম ছেয়ে - দেশ
রাগ
প্রতিমা দিয়ে কি পূজিব তোমারে -- জয় জয়ন্তী
রাগ
তোমারেই ভালোবেসেছি আমি
--দরবারি কানাডা
মলয় আসিয়া কয়ে গেছে কানে --
নটমল্লার
সেদিন সুনীল জলধি হইতে -
ভুপকল্যান
মেবার পাহাড় মেবার পাহাড় -
ইমন কল্যান।
দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর বাংলা
গানে টপ খেয়ালের প্রয়োগ ঘটিয়ে সুরে নতুনত্ব এবং বৈচিত্র্য নিয়ে এলেন। টপ খেয়ালে
নিবদ্ধ তাঁর গানগুলি হয়ে উঠল অনবদ্য এক সৃষ্টি। টপ খেয়ালের বৈশিষ্ট্য হলো,
এ-গানে কোনো তীব্র উচ্চকিত তালের ব্যবহার নেই, টানা একটা সুরের চলন , সঙ্গে থাকে
সাত মাত্রার যৎ তাল, টপ্পার দানার সঙ্গে মিশে প্রাণে মধুর এক কারুণ্যের সৃষ্টি করে। এই বিদ্যা তিনি রপ্ত
করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথের থেকে, মুঙ্গেরে থাকার সময়ে।কয়েকটি টপ খেয়ালের উল্লেখ
করি... আমার কাছে তো অসাধারণ মনে হয়।
টপ খেয়াল
ক) কি দিয়ে সাজাব মধুর
মুরতি
খ) মলয় আসিয়া কয়ে গেছে
কানে
গ) একি মধুর ছন্দ, মধুর গন্ধ
ঘ) আমি চেয়ে থাকি দূর
সান্ধ্য গগনে ।
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের
ধ্রুপদ ও খেয়াল দুটি শাখাই তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল । ঠুংরি গানের রীতি তিনি গ্রহণ করেননি ; আর বাউল, ভাটিয়ালি ইত্যাদি
লোকসঙ্গীতের ধারাতেও তিনি গান রচনা করেননি। তবে তার কয়েকটি কীর্তনাঙ্গ গান
রয়েছে।
অকালেই নিভে গেল যে প্রদীপ
১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে
জানুয়ারিতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাঁকুড়াতে বদলি হলেন । তিন মাস পরে বদলি হয়ে মুঙ্গেরে
যান। কিন্তু এই সময় তিনি সন্ন্যাস রেগো আক্রান্ত হন এবং এক বৎসরের জন্য ছুটি
নেন। এরপর ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২ মার্চ তারিখে চাকরি থেকে স্বেচ্ছাঅবসর নেন। আর ১৯১৩ সালের ১৭ ই মে তে তিনি বিদায় নিলেন এ পার্থিব দুনিয়া থেকে । সারা জীবন
গান গেয়ে সকলকে শুধু আনন্দ দিয়েই গেলেন । ভবিষ্যতের জন্য যে সংরক্ষণ
প্রয়োজন ,সে কথা একবারের জন্যেও ভাবলেন না ! আসলে কি ,নতুন গান সৃষ্টির তাৎক্ষণিক
আনন্দে মেতে উঠে পরক্ষণেই সে-গানের কথা কি তিনি বিস্মৃত হতেন! কেন যে তাঁর পাঁচ শতাধিক গানের
মধ্যে এক-চতুর্থাংশও স্বরলিপিবদ্ধ হলো না! তবে কি তাঁর নিজের সৃষ্টির
প্রতি কোনো মমতা ছিল না? জীবদ্দশায় এই প্রশ্নগুলো যদি তাকে কেউ করতেন তবে নিশ্চয়ই তিনি তাঁর সৃষ্টি - গানের স্বরলিপি
প্রণয়নে, সংরক্ষণে এবং প্রচারে সচেষ্ট হতেন। । তাঁর গান যতই আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে
থাক, বাঙালি-হৃদয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল কিন্তু অবহেলিত বলেই আমার মনে হয়।
পরবর্তীকালে, কীর্তিমান
পুত্র দিলীপকুমার রায় তাঁর নানা পর্যায়ের গান নিয়ে ছিয়াত্তরটি গানের স্বরলিপি করে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন । বত্রিশটি
হাসির গানেরও স্বরলিপি করে ছেপেছেন তিনি। দিলিপ কুমার রায়ের গভীর সংগীতবোধ অধিকাংশ দ্বিজেন্দ্রগীতিকে
তাঁর সংগীতবিবেক দিয়ে পুনর্বিন্যস্ত করে বারবার গেয়ে শুনিয়ে প্রায় বিস্মৃত
দ্বিজেন্দ্রগীতি সম্ভারকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পী এবং শ্রোতাদের জন্য অসাধারণ
একটি কাজ করে গেছেন বলে আজও তাঁর গানের চর্চা খুব সামান্য পর্যায়ে হলেও সম্ভব
হচ্ছে।
কৃতজ্ঞতাঃ
১।। দিলীপকুমার রায়, মহানুভব
দ্বিজেন্দ্রলাল, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৬৬;
২। করুণাময় গোস্বামী,
সঙ্গীতকোষ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৫;
৩। ।সুধীর চক্রবর্তী,
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-স্মরণ বিস্মরণ, কলকাতা, ১৯৮৯
৪। বাংলা গানের সন্ধানে,
কলকাতা
৫। দ্বিজেন্দ্রলালের হাসির গান
ও প্রেমের গান ---শান্তি সিংহ ,কালি ও কলম সাহিত্য পত্রিকা।
৬। দ্বিজেন্দ্রলালের বহুমাত্রিক
সঙ্গীত প্রতিভা-অমিত দে-- IRJIMS KORIMGANJ,ASSAM ,AUG ,2016
৭। https:// bn.m
.wickepedia.org.


0 মন্তব্যসমূহ