সম্পর্কে'র সমীকরণ/ সাঁজবাতি
রোজ দুপুরবেলা মেয়েকে খায়িয়ে নিজে খাওয়া-দাওয়া সেরে গান নিয়ে রেওয়াজ করার অভ্যাস টা ছিল তিস্তার রোজকার রুটিন...
জীবনের একটা সময় গানই ছিল তার সবথেকে প্রিয় বন্ধু... তাই সেই অভ্যাসটা এতটা বয়স পেরিয়ে এসে আজও ত্যাগ করতে পারেনি।
সকাল থেকে উঠে সারাদিনের প্রচুর ব্যস্ততা থাকে তার। রান্না করা ,ঠাকুর পূজা করা,
গৃহস্থলীর কাজকর্ম এসবের মধ্যে দিয়ে ই সারাদিনটা কেটে যায়।
তবে যেহেতু স্বনির্ভরতা য় বিশ্বাসী সে,
তাই দুটো টিউশনি করে হাত খরচ চালানোর জন্য ।
সেদিন থেকেই সে মনে করেছিল,ছেলের অভাবটা মাকে কোনদিনও বুঝতে দেবে না।
ছোটবেলা থেকেই স্বনির্ভরতায় ভীষণভাবে বিশ্বাস করতো সে।
একটা মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানো,নিজে রোজগার করাটা ভীষণভাবে প্রয়োজন... এই concept
এ তার ভীষনভাবে বিশ্বাসী।
কিশোরী বয়স থেকেই তার প্রচুর সম্বন্ধ আসতে শুরু করে কিন্তু সে ঠিক করেই নিয়েছিল ,কখনো বিয়ে করবে না। হঠাৎ তার একটা সন্মন্ধ এল।ছেলে ব্যাংকে চাকরি করে।মোটা টাকা মাইনে।ভালো ঘর ,তাই তার মা সম্বন্ধটা কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায়নি।
মা বুঝিয়েছিল পড়াশোনা করার সময় কি চলে গেছে__ বিয়ের পরেও তো পড়াশোনা করা যায়...গান গাওয়া যায়। ছেলের বাড়ি থেকে এইরকমই কিছু বলেছিল __যে বিয়ের পরে সমস্ত রকম পড়াশুনাও গান ইত্যাদি দায়-দায়িত্ব সব তাদের ।
তাই একরকম জোরাজুরি করেই মেয়েকে রাজি করিয়ে ফেললেন বিয়ের জন্য ।মায়ের মুখের উপর না করতে পেরে ,সে রাজি হয়ে গেল বিয়ের জন্য। কিন্তু মন যেন কোথাও একটা সায় দিল না।
আজ পনেরোটা বছর পেরিয়ে গেছে। অতীতের কথা মনে পড়লে কষ্ট হয়। স্বপ্নগুলো ধুলিসাৎ হয়েগেছে। ইচ্ছে ছিলো গান গেয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের একটা পরিচয় গড়ে তুলবে। কিন্তু নিয়তির বেড়াজালে পড়ে কিছু ই সম্ভব হয়ে ওঠেনি।
যাইহোক শ্বশুর, শাশুড়ি গত হয়েছেন দুই বছর হয়েছে। কিন্তু তবুও স্বামীর সাপোর্ট, ভরসা সেভাবে কোনোটাই সে পায়নি কোনদিন।সেই আন্তরিকতা বা ভালোবাসার টান অনুভব করেনি কখনও,যেটা প্রত্যেকটা মেয়ে চায়।
এসব দুঃখ যন্ত্রনা প্রায় ভুলেই গেছিল তিস্তা। ছোট্ট মেয়েকে বড় করতে করতে কেটে যাচ্ছিল তার জীবনটা বেশ। নিজের স্বত্বা, পারদর্শিতা কে একেবারেই বিসর্জন দিয়ে দিয়েছিল।সে শুধু কারো মা আর কারো স্ত্রী ছিল ব্যাস। এতটুকু ই পরিচয় যথেষ্ট ছিল তার সমাজের চোখে।
আফশোস করার সময়টুকু ও ছিল না তার। শুধু মাঝেমধ্যে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে জানালার বাইরে থেকে যখন আকাশ টা দেখত, তখন বুকের ভিতরে মোচড় দিয়ে উঠত না পাওয়া যন্ত্রনাগুলো।দুফোঁটা চোখের জল ফেলতে না ফেলতে ই মেয়ে উঠে পড়লে সাথে সাথে চোখ মুছে ফেলত।তার যন্ত্রনাগুলো তার বড্ড একান্ত,সে চায়না তার ভাগ কাউকে দিতে।
যাইহোক বাড়ি পৌঁছে ছুটে যায় মায়ের কাছে। মায়ের ভীষন জ্বর তিনদিন ধরে। তাকে দেখাশোনা র জন্য যাকে রেখেছিল মিনতি মাসি সেও আসেনি তখনও। মাকে জড়িয়ে ধরে সে কেঁদে ফেলে।মা জিগ্গেস করে কেমন আছিস?নিরূওর থাকে সে।গায়ে বেদম জ্বর। কাছাকাছি ডাক্তার কাউকে চেনা নেই তার।এর মধ্যে মিনতি মাসি চলে আসে। সে বলে__খাটের পাশে একটা ছোট ডাইরি আছে।ওখানে ডাঃ সেনের নম্বর আছে।কল করলে বাড়িতে এসে দেখে দেবেন।খুব ভালো ডাক্তার।
পরের দিন মা অনেকটাই সুস্থ বোধ করলেন।
সকালবেলা মায়ের টেস্টগুলো করিয়ে রিপোর্ট আসলে বিকেলে ডাক্তারের কাছে গেল তিস্তা রিপোর্টগুলো নিয়ে।
বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ডাক্তারের চেম্বার।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পরে ভিতরে গেল তিস্তা।
বলল ডাক্তার বাবু আসবো? যথারীতি ডাক্তারবাবু বললেন হ্যাঁ আসুন।
টেস্ট গুলো করিয়েছেন ?কি আশ্চর্য টেস্টগুলো যে উনি করাতে বলেছিলেন সেটা উনি মনে রেখে দিয়েছেন__ কিছুটা আশ্চর্য হল তিস্তা। হয়ত মনে আছে ওনার।হতে পারে।
টেস্ট রিপোর্ট গুলো দেখে ডাক্তারবাবু বললেন তেমন কিছু হয় নি সাধারন ভাইরাল ফিভার। তিস্তা একটু আস্বস্ত হলো । বলতে বলতে ডাক্তারবাবু হঠাৎই তিস্তাকে জিজ্ঞাসা করলেন __আপনার..... আপনার বাড়ি কোথায় ?আপনি কি করেন এখন? আপনি কি হাউস ওয়াইফ ?অবাঞ্ছিত প্রশ্ন করতে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিল তিস্তা ।ঘাড় নেড়ে একরকম জবাব দিল হ্যাঁ ।কিন্তু একজন অপরিচিত মানুষকে এ ধরনের প্রশ্ন একমাত্র তারাই করতে পারে যারা পূর্বপরিচিত।
সেজন্য কিছুটা অবাক হয়েছিল সে। যাইহোক সেদিন ওখান থেকে আসার পরে দুটো দিন ভালই কাটছিল। ___মা ও সেরে উঠছে। এরমধ্যে তার স্বামী একবারও তাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করেনি তার মায়ের শরীর কেমন আছে ?সেও মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল কোনদিনও তার স্বামী ফোন না করলে সে যেচে কিছু ই জানাতে যাবেনা।
অভিমান হয়েছিল তার খুব। কিন্তু তার দাম কে দেবে?রাতে খাওয়া দাওয়ার পর যখন শুতে যাবে দেখল হোয়াটসঅ্যাপে একটা টেক্সট__ ডক্টর সেনর নাম্বারটা সেভ করা ছিল এবং একবার হোয়াটসঅ্যাপে করেছিলেন যে কেমন আছে মা জানানোর জন্য। সেখানে একটা টেক্সট দেখে খুব অবাক হয়ে উঠল তিস্তা।
সাধারণত ডাক্তাররা এই ধরনের কাজকর্ম করে থাকেন না। তারা যেচে কাউকে টেক্সট করে নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করবে না যে পেশেন্ট কেমন আছেন__ তাই অবাক হয়ে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। তার পরে হাতে ফোনটা নিয়ে রিপ্লাই দিলো__ হ্যাঁ আগের থেকে অনেকটা ভালো আছে। আধঘন্টা পর আরেকটা টেক্সট এল__একটা কথা জিজ্ঞেস করবো? যদি কিছু মনে না করেন ___এবার তিস্তা রীতিমত অবাক হয়ে গেল। একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ডক্টর তাকে জিজ্ঞাসা করছে এভাবে, সে এটা বুঝতে পারল না যে কারণটা কি! তিস্তা বলল হ্যাঁ বলুন কি ব্যাপার? ওদিক থেকে রিপ্লাই এলো__ গানটা কি এখনো গাওয়া হয় ?না গানটা ছেড়ে দিয়েছেন? তিস্তা রীতিমত একটু অবাক হয়ে গেল। একসময় সে গান গাইতো বটে ।তবে অনেকদিন আগেকার ব্যাপার। সেভাবে আর এখন কোথায় গান গাওয়া হয়? কিন্তু উনি কিভাবে জানলেন? উনি কি তাকে আগে থেকে চিনতেন, নাকি অন্যকিছু ?বিভিন্ন রকম প্রশ্ন তার মাথায় ভিড় করতে থাকলো ।সহ্য না করতে পেরে জিজ্ঞাসাই করে ফেলল আপনি কি করে জানলেন যে আমি গান গাইতাম ?এরপরে ফোনের দিকে তাকিয়ে প্রায় একঘন্টা জাঁকিয়ে বসে রইল __কোন রিপ্লাই এলো না। এক সময় ফোনটা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়ল ।
সকালে ঘুম থেকে উঠে যথাযথ কালকে রাতের ব্যাপারটা ভুলেই গেছে ,চা খেতে বসে হঠাৎ করেই মাথায় নড়েচড়ে বসল __আরে কালকে রাতে আমাকে একটা টেক্সট করেছিলো ডাক্তার সেন এটার কারনটা খুব জানতে ইচ্ছে করলো ।মিনতি মাসি কে জিজ্ঞাসা করল আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞাসা করব ?এই ডাক্তার সেনের বাড়িটা কোথায় আমাকে বলতে পারবে ?না মানে উনি কোথায় থাকেন সেটা বলতে পারবে? মিনতি মাসি বলল আরে ডক্টর সেন হত আমাদের পাশের পাড়ারই ছেলে।ও পাড়ার সবথেকে ভালো ছেলে তুমি জানতে না ওকে?
সাগর সেনের যা ঠিকানা মাসি বলল_তা তাদের বাড়ি ছাড়িয়ে কিছুটা দুরেই, পাশের পাড়ায় ওনাদের বাড়ি। কিন্তু কোনদিনও তো সেভাবে ওনাকে দেখা হয়নি। অথবা সুযোগটাই হয়তো কোনদিনও পাই নি,কারণ বেশিরভাগ সময় গান, পড়াশোনা এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকত ।বাইরের কে কোথায় কি করে বেড়াচ্ছে তা কোন দিকে সেভাবে দেখার তার ঝোঁক ছিল না । তার কাছে পরিস্কার হলো পুরো ব্যাপারটা।যে উনি বোধহয় তিস্তাকে চিনতেন।
পরের দিন রাতে আবার একটা টেক্সট এল _আপনি গানটা তো আবার শুরু করতে পারেন ।শুরু করছেন না কেন ?এবার তিস্তা একটুখানি কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল__আপনি কি আমাকে চেনেন? রিপ্লাই এলো না ।কিছুক্ষন পরে আর একটা টেক্সট __সংসার করলে কি বুঝি গানটা ছেড়ে দিতে হয়? তিস্তা র মনের সুপ্ত বাসনা টাকে যেন এক ঝটকায় জাগিয়ে দিয়ে গেল কেউ। যেটাকে সেএতদিন বন্ধ করে রেখে দিয়েছিল মনের একটা কোনে।কে যেন সেটার দরজাটা হাট করে খুলে দিয়ে গেল ।রিপ্লাই এ বলল __ওই আর কি আর হয়ে ওঠে না । এতোটুকুই উওর।
এভাবে তিন চার দিন পর পর টেক্সট আসতে থাকে।ঐ একটা কথাই গানটা শুরু করার জন্য। প্রতিদিন রাতে বেলা টেক্সট না আসলে তিস্তা ছটফট করতে থাকে ,কারণ কোথাও না কোথাও তার মনের সুপ্ত বাসনা গুলো ছিল ,যে সুপ্ত বাসনা গুলো কেউ একজন মনে হয় জাগিয়ে দিচ্ছে প্রতিদিন ।
তাকে বলতো কিভাবে সে তার গানটাকে নিয়ে ভাববে ?কিভাবে গানটাকে নিয়ে ক্যারিয়ার করবে__ এসব __ওপারের মানুষ টা খুব করে চাইত যেন তিস্তা নিজেকে কোথাও হারিয়ে না ফেলে। নিজের প্রতিভাকে যেন কোথাও হারিয়ে না ফেলে।
তিস্তা পরদিন ই ফিরে যায় ।বাড়িতে ফেরার আগে ভীষণভাবে ইচ্ছে ছিল ডক্টর সেনের র সাথে একবার দেখা করে যাওয়ার কিন্তু হয়ে ওঠেনি ।কেন না জরুরী কাজে বাইরে চলে গেছিলেন ।যাবার আগে তিস্তাকে বলে গেছিলেন কিছুদিন থাকবেন না, কোন অসুবিধা হলে তাকে ফোন করে নিতে ,অথবা হোয়াটসঅ্যাপ করে নিতে ।তিস্তা বাড়ি ফিরল সবই আগের মতই রইলো ,কিন্তু কোথাও যেন তার সেই মনের যে বন্ধ দরজাটা খুলে গিয়েছিল ,সে দরজাটাকে সে আর বন্ধ করতে পারছিল না। বারবার এসে দমকা হাওয়া তার মধ্যে ধাক্কা দিচ্ছিল। মনের সুপ্ত বাসনা গুলোকে সত্যি করার জন্য, যে স্বপ্নগুলো সে এতদিন ধরে দেখে এসেছে ,সে স্বপ্ন গুলো যেন এক ঝটকায় সত্যি হতে দেখতে পাচ্ছিল ।রজতের কাছ থেকে সে যেটা যেটা আশা করেছিল সেটা সে কোনদিনও পাইনি ।কিন্তু একজন বাইরের মানুষ এসে তাকে দু দিনের মধ্যে এমনভাবে মনের মধ্যে শক্তি যুগিয়েছে যে সেও স্বপ্ন দেখে যে , সে ও কিছু করতে পারবে ।কিছুতেই ভুলতে পারছে না তার স্বপ্ন গুলোকে।
সত্যি হতে দেখতে পাচ্ছে। গৃহস্থালির কাজ করছে ,সমস্ত কাজ__ কিন্তু তার মধ্যে থেকেও সে প্রতিক্ষন স্বপ্নগুলোকে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। যে স্বপ্নগুলো তাকে ডাক্তার সেন দেখিয়েছেন ।তার নিজের স্বপ্ন। তার নিজের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন। যা তার স্বামীর কাছ থেকে সে দেখতে চেয়েছিল। তার স্বামী তার জন্য এতটা ভাবুক, এতটা চিন্তা করুক,কিন্তু সেই সাপোর্টটা সে কোনদিনও পাইনি । কিছুদিন বাদে একটা চিঠি এলো বাড়িতে ।অল ইন্ডিয়া মিউজিকাল কম্পিটিশনের একটা অডিশনের চিঠি তিস্তার নামে। তিস্তার আনন্দের সীমা ছিল না সেদিন। কিন্তু কে তার অডিশনে নামটা দিয়েছে সেটাই বুঝে উঠতে পারছিল না কিছুতেই ।অনেক ভাবল_ অনেক ভাবল কিছুতেই মাথায় আসছেনা। আধঘণ্টার মধ্যে ডক্টর সেনের একটা টেক্সট এল__
সামনের সপ্তাহে অডিশন আছে, ভালো করে রেডি হয়ে নিন। বিজয়ী কিন্তু হতেই হবে। অজানা অচেনা একজন মানুষ হয়ে দুদিনে তার কথা এতটা ভেবেছে ।কী করে ?তার মাথায় ঢুকলো না কিছুতেই। একজন এত বড়মাপের ডাক্তার হয়ে,এত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হয়ে, তার মত সাধারণ একটা মেয়ের জন্য এতটা করছে কেন ?তার সম্পর্কে কতটাই বা জানেন? বিন্দুবিসর্গ কিছুই তো জানেনা । জানতে ইচ্ছা হলো কারণটা। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটা নিয়ে টেক্সট করলো আপনি আমার জন্য এতটা কেন ভেবেছেন? রিপ্লাই এলো __মানুষই তো মানুষের জন্য ভাববে ...পছন্দ না হলে যাবেন না । এরপর আর উত্তর দেওয়ার মতো কিছু রইল না ।বিকেলে রজত অফিস থেকে বাড়ি ফিরে এলে তাকে অডিশনের কথাটা তিস্তা বলে। __নামটা উল্লেখ করেনি কার মারফত হয়েছে কিন্তু সেটা শোনার আগ্রহ দেখায়নি সে। একদমই উদাসীন। ভালো-মন্দ কোন কিছু নেই । এসব আবার নতুন পাগলামি শুরু হয়েছে উওর দিল। পনেরো টা বছর সংসারের দিয়েছে ।নিজের জন্য কিছু ভাবেনি। যখন নিজের জন্য সে ভাবতে গেল একবার__তার স্বামীর কাছে পুরো ব্যাপারটা পাগলামি বলে মনে হল। মনে মনে ঠিক করল __ঠিক আছে পাগলামি নাহয় করলাম। কাজের মাঝে মাঝে অবসর সময় একটু রেওয়াজটা নিয়ে বসত। দিন সামনে এলো___ অডিশনে গেল। খুব ভালো হয়েছে । অডিশনে সিলেক্ট হয়ে গেছে তিস্তা ।
গেট থেকে বেরিয়ে কাউকে একটা খুঁজে ছিল। সামনে এসে দেখল ,সাদা গাড়ি থেকে নেমে এলো ডক্টর সেন। দৌড়ে গেল তিস্তা। আনন্দের সঙ্গে বলল, আমি সিলেক্ট হয়ে গেছি__ কিন্তু এই জায়গায় তো রজতের থাকার কথা ।তার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। উনি তো কেউ হয়না তিস্তার। কি সম্পর্ক ওদের? কোনো সম্পর্কই নেই ।তাহলে তিস্তার প্রতি কিসের এত টান? এমনি ভবিষ্যতের জন্য ঐরকম একটা সুযোগ করে দিলেন ।একাধিক প্রশ্ন মনের মধ্যে আসতে থাকলো। কংগ্রাচুলেশন বলে হঠাৎই বেরিয়ে গেল ডক্টর সেন। তিস্তা কিছুক্ষন ঐ পথে চেয়ে থাকল তারপরে ভাবলো __ মাকে অনেকদিন দেখিনি একবার দেখে তারপরে বাড়ি ফিরবে।
রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ করে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানটা চোখে পড়ে ,পাশে ডক্টর সেন এর বাড়ি। মিনতি মাসির ঠিকানা অনুযায়ী আন্দাজ করে সে।
মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় তার__ কিছুতো একটা ব্যাপার আছে , কেউ কারো জন্য এতটা কি করে ভাবতে পারে? সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না। এমন সময় হঠাৎই তার ছোটবেলাকার এক বান্ধবীর সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। হঠাৎ করে এই কথা ঐ কথায় ডক্টর সেনের প্রসঙ্গটা এলো। বান্ধবী বলল সাগরদা কে মনে আছে তোর? কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো তিস্তা সাগর দা? সাগরদা কে ভুলে গেছিস? কলেজে যখন পড়তো দু-একবার নামটা শুনে ছিল। অনেকটাই সিনিয়র ছিল ওদের থেকে। বান্ধবীটি বলল আরে সাগর সেন__ এই যে , যার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিস, এটাতো ডঃ সাগর সেনের বাড়ি। বান্ধবীটি বলল জানিস ছোট্টবেলা থেকে সাগরদা একজনকে ভালবাসত। কিন্তু তাকে কখনো বলতে পারেনি তাই বিয়েটা আজও করে উঠতে পারেনি। তিস্তা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল কে মেয়েটি জানিস? বান্ধবী টি বলল না সেভাবে নয় তবে শুনেছি দাদার মুখে __ও হ্যাঁ মেয়েটা ভালো গান করত।ব্যাস এতটুকুই বলেছে। তিস্তার কাছে সবকিছু যেন কিছুটা পরিষ্কার হয়ে গেল । হাজার টা প্রশ্ন এল মনের ভিতর। খুব আবছা একটা মুখ ভেসে এলো ,যে মুখটা এখনকার সাগর সেনের সাথে ঠিক সেভাবে মেলেনা ।
বান্ধবীর দাদা আর সাগরদা দুজন বন্ধু ছিল ।দুজনেই ডাক্তার ।দাদার থেকেই বান্ধবীও জেনেছে সবকিছু।কোনদিনও জানানোর সুযোগ পায়নি, সুযোগ পেলেও হয়তো সময়টা খুব তাড়াতাড়ি চলে গেছিল। হাজার একটা প্রশ্ন তিস্তা র মনকে ঘিরে ধরলো।
তিস্তা র মনে একটাই প্রশ্ন থাকে ,একটা মেয়ের জন্য সারাটা জীবন নষ্ট করে দেওয়ার কোন মানে আছে? এটাই বোধহয় ভালোবসা । বান্ধবীর কথা শুনে তার মাথার ওপরে পুরো আকাশটা যেন ঘুরতে থাকে, পায়ের তলার মাটি সরে যায়।মেয়েটি সে নয়তো? এমন একটা ভালোবাসার মানুষ কি তার কোথাও ছিল?সে ই কি সেই ভাগ্যবতী মেয়েটি? কিন্তু যে সংসারে সে বাস করছে , সেখানে সেই ভালোবাসা টা সে পায়নি, তার জীবনের এতটা সময় সে যেখানে অতিবাহিত করেছে । খুব আফসোস হচ্ছিল। কেন আফসোস হচ্ছিল ,সে নিজেও বুঝতে পারছিল না। কান্না পাচ্ছিল ।গলাটা ধরে আসছিল ।বান্ধবীকে বলল আসিরে পরে কথা বলব ।
বাড়ি না ঢুকে একটা পার্কে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলো। পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন ।হঠাৎই একটা টেক্সট এল বাড়ি পৌঁছে গেছেন ? ডক্টর সেন____এর । খুব রাগ হলো তিস্তার তার উপর ।কেন কিছু বছর আগে তাকে বলে উঠতে পারেনি সে ?যাকে ভালোবাসে যদি বলে না উঠতে পারে ,তবে আজ কেন এতটা চেষ্টা তার জন্য করছে ?আজ তার হাতে কিচ্ছু করার নেই। সে দায়বদ্ধ সংসারের কাছে ।কেন ডক্টর সেন নিজের জীবনটাকে নষ্ট করে দিলেন ? এভাবে একটা মেয়ের জন্য ....বিভিন্ন রকম প্রশ্ন মনের মধ্যে চলতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যে রিপ্লাই না আসার ফলে কল ব্যাক করেন ডঃ সেন। কখনো করেননি সেভাবে ফোনটা। রিসিভ করল তিস্তা। ধরা ধরা গলায় বলল কি হয়েছে বলুন ?ডঃ সেন বলল বাড়ি ফেরেন নি এখনও ?উওর দিল না। একটু কাজ আছে কাজ সেরে বাড়ি ফিরব। একটুর জন্যও বুঝতে দেয়নি যে, সে সব টা জেনে গেছে। উত্তর এল ঠিক আছে ,সাবধানে ফিরবেন। অবাক হয়ে যায় তিস্তা, কোন দাবি ছাড়া ,স্বার্থ ছাড়া ,কি করে একটা মানুষ একটা মানুষের জন্য এভাবে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারে শুধুমাত্র তাকে ভালোবসে? এমনকি ভালোবাসা কথাটা বলার ও সাহস পর্যন্ত সে কখনো করে উঠতে পারেনি । যদি প্রত্যাখ্যাত হয় সেই ভয়ে ,নাকি অন্য কিছু? রাগ,অভিমান,দুঃখ ঠিক কোন অনুভূতিটা যে তখন হচ্ছিল_ তার মনে, সে মেলাতে পারছিল না।
তিস্তা বাড়ি ফিরল, দেখল রজত এসে বাড়িতে বসে রয়েছে ।ঢুকতেই একরাশ কটুক্তি করে বললো__ নাচাগানা কমপ্লিট হল ? তিস্তা র সাফল্যটা তার কাছে নাচাগানা ছিল ।কোন উত্তর করল না তিস্তা। জামা কাপড় ছেড়ে পরিষ্কার হয়ে, রান্নাঘরে গেল রান্না করলো । তিস্তা দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি সেদিন।কি একটা পাওয়া যেন তার হলো না জীবনে।কি যেন জীবন থেকে তার হারিয়ে গেল। সে যে রকম জীবনটা চেয়েছিল সেটাও তো হতে পারতো। চুপ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো চোখ থেকে।একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে। কিছুদিন বাদে গানের ফাইনাল অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাবে। সাগরদা বলেছে যেন উইনার হয় তিস্তা।সমস্ত প্রতিকুল পরিস্থিতি তেও তিস্তা রেওয়াজ চালিয়ে যায়। কিন্তু মনটা যেন তার কাছে ছিল না।ফোনটার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় বসে থাকতো যদি একটা টেক্সট আসে, যদি কেউ একবার খবর নেয় , মনে হতো এটা কি অন্যায়? সেকি ভুল করছে? তখন নিজের মনকে সে বুঝাত না ভুল কিছু করেনি সে। ভুল হচ্ছে সেটা যেটা এতদিন তার সাথে হয়ে এসেছে। অনুষ্ঠানের দিন যত সামনে ঘনিয়ে এলো রজতের খারাপ ব্যবহারগুলো দিন দিন যেন আরও বৃদ্ধি পেতে লাগল ।
মনে হল যেন তিস্তা যদি কোনো কারণে এ কম্পিটিশন টা জিতে যায় তাকে মনে হয় আর রজত নিজের আয়ত্তের মধ্যে রাখতে পারবেনা। সে নিজে প্রতিষ্ঠিত হলে তখন রজতের ধরাছোঁয়ার মধ্যে আর থাকবে না ।এটা মনে হয় রজতকে তাড়া করে বেড়াত। তাই বিভিন্ন রকম ভাবে চেষ্টা করব যাতে তিস্তা কিছুতেই না গানটা চালিয়ে যেতে পারে। তিস্তা ও অনড় ,সে যতই কষ্ট হোক, সে তার স্বপ্ন পূরণ করবেই।
সেই বিশেষ এই দিনটি এলো । একটু ভয় করছিল তার।এত বড় প্রোগ্রাম এ এসে কোনদিনও এর আগে পার্টিসিপেট করেনি। রজত কে বলেছিল তার প্রগ্রামে আসার জন্য কিন্তু সে সরাসরি না করে দিয়েছে। সে এসব ন্যাকামো তে থাকতে পারবে না। একাই গেল তিস্তা। কিছুটা ভয়ও লাগছিল তার। গ্রিনরুমে যখন মেকাপ করছে তখন একজন এসে বলল__আপনার সাথে একজন দেখা করতে চায়।শুনে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো সে বুঝতে পারল কে আসতে পারে?
মনে মনে এটাও ভাবলো, এত বড় ব্যক্তিত্ব হয়েও, কি করে একটা সাধারণ মেয়ের জন্য সে এতটা করতে পারে?সব কাজ ফেলে তার জন্য ছুটে এসেছে একজন। মেয়েটার কাছ থেকে তার কোনো দাবি নেই। কোন চাহিদা নেই। শুধু একটা মানুষকে ভালোবেসে সারাটা জীবন তার নামে অতিবাহিত করে দেওয়া যায়? সে কি মানুষ না দেবতা? এই উত্তরটা অনেকবার খোঁজার চেষ্টা করেছে তিস্তা কিন্তু পাইনি। ছুটে গ্রীন রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দেখল হ্যাঁ সত্যি সাগরদা দাঁড়িয়ে আছে। মনে একটু বল পেল। বলল আপনি এসেছেন__ সাগর সেন বড় মাপের ডক্টর। অনেক নামডাক ।এত ব্যস্ততার মধ্যেও সাধারণ একটা মেয়ের জন্য তার এতটা সময় অতিবাহিত করছেন। সাগর সেন এসে বলল আপনার প্রোগ্রাম, আর আমি আসবো না ?বেস্ট অফ লাক ।খুব ভালো করে গানটা গাইবেন। আর একটুও ভয় পাবেন না। কথাটা বোধহয় রজতের কাছ থেকে আশা করেছিল তিস্তা। কিন্তু পাইনি ।সাধারণত ভুল মানুষকে দাম দিতে গিয়ে আমরা আসল মানুষকে সব সময় হারিয়ে ফেলি। স্টেজে বসে রীতিমতো সাগর সেন প্রোগ্রামটা পুরোটা দেখেন সেটা গান গাওয়ার সময় লক্ষ্য করেছিল তিস্তা।সাগর সেন শ্রোতা র আসনে বসে আছেন।
গানের পর্ব শেষ হওয়ার পরে রীতিমতো বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয় ।তিস্তার বুকের ভেতরটা আনন্দে ভরে ওঠে। তার এতদিনকার স্বপ্ন এত বড় একটা গানের অনুষ্ঠানে উইনার হয়েছে সে ।তার জীবনের এত বড় স্বপ্ন সে পূর্ণ করতে পেরেছে। একটা এমন মানুষের জন্য, যে মানুষটার জন্য সে কোনোদিনই কিছু করতে পারেনি। সে মানুষটাকে সে কোনদিনও সেভাবে চেনেই না ।তবু সেই মানুষটা তার স্বপ্ন গুলোকে মনে রেখে, সে স্বপ্ন গুলোকে পূরণ করতে সাহায্য করেছে। প্রাইজটা নেওয়ার সময় তিস্তার খুব মনে হলো একবার সাগর সেন কে ডেকে নিতে। কিন্তু কি পরিচয় ডাকবে সে? কি বলবে কে হয় উনি? বিচারকরা সন্মান তার হাতে তুলে দেন। তাকে সম্মানিত করেন, কিন্তু তার দুটো চোখ সাগর সেনের দিকেই বারবার চাইছিল। ভীষন ডাকতে ইচ্ছে করছিল তাকে কিন্তু পেরে উঠলো না কিছুতেই।
কিছু একটা বাধা দিচ্ছিল কোথাও। স্টেজ থেকে নেমে গেট থেকে বেরোনোর সময় সাগর সেন তিস্তা কে congratulations জানায়। বলে এর পরে কিন্তু ক্যারিয়ার টাকে আরো বাড়াতে হবে ।একটা জায়গায় পৌঁছাতে হবে। তিস্তা নিজের ইমোশনটাকে আর বোধহয় চেপে রাখতে পারলো না। সজল নয়নে বলে ফেলল__কেন করলেন আপনি এসব আমার জন্য ?আমি আপনার কে ?অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিলন বোধায় ডাক্তারবাবু। উনি কি বুঝতে পেরে গেলন সব ব্যাপারটা ? আর নিজেকে সামলাতে পারল না । তিস্তা আবার প্রশ্ন করল ___বলুন আপনি, কি করে জানলেন আমি ভালো গান গাই? আপনি কেনই বা আমার জন্য এতটা সুযোগ করে দিলেন ? আপনি কতদিন চেনেন আমাকে? হাজার একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল সাগর সেনের দিকে। চেয়ে রইল তার দিকেই...
মনে মনে ঠিক করল যাই হয়ে যাক কাল একবার সাগর সেনের কাছে যাবে।যে মানুষটা সারা জীবন তার জন্য নিজের জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছে, এটা ঠিক নয় ।এটা ঠিক হতে পারে না কখনো। রাতে বাড়ি ফিরল সে,ফিরে প্রচন্ড অশান্তির সম্মুখীন হতে হলো তাকে। রজত কোনদিন মেনে নিতে পারেনি তিস্তা জীবনে সফলতা পাক।
প্রচন্ড অপমান করল তাকে। বলল বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে। সে মনে মনে ঠিক করেছিল সেখানে আর থাকবেনা সে। বেরিয়ে আসবে সেখান থেকে। এটা ভেবে কখনো সেই সিদ্ধান্ত নেয়নি যে, তার পরবর্তী জীবন কি হতে চলেছে ,সে কি সিদ্ধান্ত নেবে সে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিল না।
শুধু একটুখানি মনে ছিল যে যে সেখানে অপমানিত হয়ে আর থাকবে না। সবটাই যখন মিথ্যে হয়ে গেল তার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে, সে তার সাথে আর থাকবে না।
পরের দিন সকালে মেয়েকে নিয়ে সে চলে আসে বাপের বাড়ি ।মায়ের কাছে মেয়েকে রেখে প্রথমেই গেল সাগর সেনের কাছে ।সাগর দার বাড়িতে বেল বাজাতেই, একজন দরজা খুলে দিল। বলল সাগরদা বাড়িতে আছে ?ডক্টর সাগর সেন থেকে কখন যে সাগরদা হয়ে গেছে সে নিজেও জানে না। কিন্তু সেটাই তার বলতে ইচ্ছে করছিল। লোকটি বলল আপনি কি তিস্তা দেবী ? তিস্তা বলল হ্যাঁ কেন বলুন তো ?আপনি কি করে চিনলেন আমাকে ? বলল দাদাবাবু তো আজ সকালের ফ্লাইটে লন্ডন চলে গেছে। তিস্তা র যেন পায়ের থেকে মাটিটা সরে গেল। মনে হল যে, তার সবকিছু বদলে শেষ হয়ে গেল । সে মনে করেছিল, ভুল গুলো শুধরে, নিজে কোন কিছু শুরু করবে নতুন করে। কিন্তু তার ভরসার হাত, তার সফল হওয়ার যে প্রেরনা, সে তার কাছ থেকে এভাবে দূরে চলে গেলে__ কিছু না বলে ।লোকটি বলল, দাদাবাবু যাওয়ার আগে একটা চিঠি দিয়েছে আপনাকে দেওয়ার জন্য, একটু দাঁড়ান আমি নিয়ে আসছি। চিঠিটা হাতে নিয়ে তখন আর পড়েনি দুচোখের জল যেন বাঁধ মানছে না ।সে দৌড়ে বাড়ি চলে এল। ঘরের দরজাটা বন্ধ করে, চিঠিটা খুলল। চিঠিতে লেখা আছে__" আমি সবটাই বুঝতে পেরেছি ।তুমি সবটা জেনে গেছে ।তোমার আচরণ বলে দিচ্ছিল ,তোমার কিছুই অজানা নয়। যে কথাটা তোমাকে কোনদিনও বলা হয়নি, বলবো ভেবেছিলাম সেই সতেরো বছর আগে ,সেই সময় যখন বলতে পারিনি, আজও চাই না সেটা বলে তোমাকে ব্যতিব্যস্ত করতে ।চেয়েছিলাম নিজের স্বপ্নটা পূরণ করো, নিজের পায়ে দাঁড়াও ।সেটা আমি করে দিয়েছি। কখনো চাইনি তোমার সংসারটা ভেঙ্গে যাক। আমি শুধু চেয়েছি তুমি ভালো থাকো।
সাগর দা জানত সে খুব সুখী আছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে কতটা অসহ্যকর যন্ত্রনা নিয়ে চলেছে , তার খোঁজ সাগরদা রাখল না।একজন পাশে থাকতো , কোন সম্পর্কে নাম কি দেওয়া খুব প্রয়োজন? দীর্ঘ পনেরো বছরে তো আসলে কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। একটা পুতুল খেলার ঘর ছিল ।প্রাণহীন ভালোবাসা হীন একটা পুতুল খেলার সংসার। এতদিন তিস্তা খেলেছিল। না কেউ তাকে মন প্রাণ উজাড় করে এভাবে ভালোবাসেছে।আর যখন সেটা সে জানল, তার সাথে একবার মন খুলে কথাটা পর্যন্ত সে বলতে পারলোনা। এটা ছিল তার সবচেয়ে বড় আফসোস।
সেদিন তিস্তা খুব কেঁদেছিল, ভীষণ কেঁদে ছিলো। তারপর থেকে কোনদিনও আর সাগর দাকে একদিনের জন্য ফোনও করেনি ।হোয়াটসঅ্যাপে টেক্সট করেনি। ব্লক করে দিয়েছিল হোয়াটসঅ্যাপ ,কল সবকিছু। অভিমান হয়েছিল ,নিজের কথাটাই যেদিন বলার ছিল, সেদিন নিজের কথাটা বললে না ।আর যেদিন তিস্তার কিছু বলার ছিল ,সেদিন নিজের কথাটা বলে এভাবে চলে গেলে ____যে তার কথাটা একবারও শুনলে গেলে না কি বলতে চায় সে।
একবারও জানার প্রয়োজন মনে করলে না। এভাবে কেটে যায় অনেক গুলো বছর। স্বামীর সাথে তিস্তার ডিভোর্সটা কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে যায়। শুনেছিল রজত পুনরায় বিয়ে করে সংসার শুরু করেছে।
একদিন বিকেলবেলা ফিরছিল গানের পোগ্ৰ্যাম করে, হঠাৎ দেখল সাগর দার বাড়ির দরজাটা খোলা ।কোথাও যেন একটা কিছুর বন্ধ দরজাটা খুলে গেল তিস্তা র। গাড়ি থামিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমে ছুটে গেল দরজার দিকে। দরজা থেকে ছুটে ঘরের ভেতরে ঢুকলো __দেখল লাইব্রেরীর সামনে একজন পিছনে ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবী পড়ে এক দেবদূত যেন। পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিস্তার বুকের ভিতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো । ধরা ধরা গলায় বলল ,সাগরদা ____সে ব্যক্তি ফিরে তাকালো, ডক্টর সাগর সেন। কত পার্থক্য ,কতটা বদলে গেছে। বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে। তিস্তা সামনে গেল ,ধরা ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করলো __কেমন আছো ?সাগর সেন উত্তর দিল___ ভালো ,তুমি কেমন আছো?এই ক বছরে আপনি কি করে যে তুমি হয়ে গেছে, সেটা নিজেরাই জানেনা ।কোনদিনও তো তুমি বলে কেউ নিজেদের সম্বোধন করেনি কাউকে। আপনি আপনি করে সম্বোধন করছে। এত বছরের দূরত্ব কি তবে ভালোবাসাকে বাড়িয়ে দিয়েছে কি কোথাও । তিস্তা উত্তর দিল তুমি যেমন রেখে গিয়েছিলে, ঠিক তেমনটাই আছি। চলে যাওয়ার আগে একবারও জিজ্ঞাসা করনি কেমন আছি ?তাহলে আজ কেন জিজ্ঞাসা করছো ?সাগর দা উত্তর দিল, যাওয়ার আগে যদি জানতাম তুমি ভালো নেই ,তাহলে আমি যেতাম না ।তোমায় ভালো রাখার জন্যই আমিতো চলে গেছিলাম। আমি যেদিন জানতে পেরেছি তুমি ভালো নেই আমি সেই মুহূর্তে ফিরে এসেছি।
সেদিন আমি তোমাকে দুর্বল করতে চাইনি। তোমার সংসারটা ভেঙে যাক ,আমি চাইনি তাই দূরত্বকে বেছে নিয়েছিলাম ।কিন্তু ___যেদিন জানলাম তুমি ভালো নেই, ঠিক সেইদিনই ,সেই মুহূর্তে আমি ঠিক করি আমি ফিরে আসবো। তিস্তা অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়ল।
দশ বছরের কান্না যেন তার বুকের মধ্যে আটকে ছিল। লুুটিয়েপড়ে সাগর দার পা দুটো ধরে জড়িয়ে সে কেঁদে বলল__ তুমি আমার স্বপ্ন পূরণ করে দিলে সাগরদা... কিন্তু আমায় ভালোবাসলে না ।যদি ভালবাসতে সেভাবেই তাহলে আমার কথাটা শোনার জন্য অন্তত একবার অপেক্ষা করতে । না সেদিন কৈশরকালে আমাকে বলে উঠতে পেরেছো__ আর এই মাঝ বয়সে এসে ও আমার কথাটা শোনার জন্য তুমি একবারও অপেক্ষা করলে না ।সেদিনও নিজের মত করে ভেবে নিয়েছিল। আজও নিজের মতো করে ভেবেই দূরে চলে গেলে।
আজকে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে ,আমার ক্যারিয়ার হয়েছে, সব হয়েছে ।কিন্তু .....কিন্তু আমি ভিতরে ভিতরে অসম্পূর্ণ ভালবাসার যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, যে ভালোবাসা পেতে আমি চেয়েছিলাম ,সে ভালোবাসা আমার এত কাছে ছিল ,তবু সে ভালবাসার স্বাদ আমি পেলাম না ।আর একটা মানুষ ,আমার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে চলেছে ক্রমশ। তাকে দু হাত দিয়ে ধরে , তুলে বলল কেঁদোনা__ আমি সারা জীবন তোমার পাশে থাকবো ।এই বয়সে এসে এই সম্পর্কের আর কি নামই বা দেবো? না কিছু সম্পর্ক নামহীন হয়ে থাক। সম্পর্কের মধ্যে নাম থাকাটা জরুরী নয়। টান থাকাটাই জরুরি ।অনেক সম্পর্ক আছে সেটার হয়তো নাম আছে ,কিন্তু প্রাণহীন____ প্রাণহীন জড়বস্তুর মত দুটো মানুষ একসাথে পাশাপাশি থেকে সারাটা জীবন___ কাটিয়ে দেয়.... কিন্তু ভালোবাসতে পারেনা ।তার থেকে ভালোবাসাময় দুটো মানুষ নামহীন সম্পর্কে বেঁচে থাক সারা জীবন। এটাই বা কম কিসের। এই বয়সে এসে আর না হয় নামটা নাইবা দিলাম সম্পর্কের। তিস্তা বলে আমার সম্পর্কের নাম চাইনা সাগর দা। তোমার ভরসা দুটো হাত তুমি আমার মাথার উপর রেখো। বট বৃক্ষের ছায়ার মতো _ব্যাস আমি আর কিছু চাই না কিচ্ছু না।
গানটা গাইতে গাইতে সাগর দার কাঁধের উপর মাথা কাঁত করে কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে যায় । অনেক কটা বছর এই কাঁধটার জন্য অপেক্ষা করেছে সে।কোথাও এই ভরসার কাঁধ টার বড্ড অভাব ছিল তার। আজ আর সেটা নেই।

.jpg)
0 মন্তব্যসমূহ